শহীদ নেতৃবৃন্দ

ব্যক্তি অনুযায়ী সাজানো তথ্য, ছবি ও আর্কাইভ।

শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযম

শহীদ প্রোফাইল

অধ্যাপক গোলাম আযম

কিছু মানুষের জন্মই হয় হিরো হওয়ার জন্য। পাঞ্জেরী হওয়ার জন্য। তাদের দিকে তাকিয়ে মানুষ আগুনে ঝাঁপ দিতেও কার্পন্য করেনা। এদের পুরো জীবনটাই সাক্ষী হয়ে থাকে মানবজাতির জন্য। এরা শহীদ, সাক্ষ্যদাতা। জীবনের প্রতিটি কাজে ইসলামের সাক্ষ্য দেয়াই ওনাদের কাজ। এমন একজন কিংবদন্তি মানুষ অধ্যাপক গোলাম আযম। একের পর এক ষড়যন্ত্রের মুখে ছিলে অবিচল, নিঃসংকোচ, নিরুদ্বিগ্ন। মহান রবের প্রতি অবিচল আস্থায় যেকোন পরিস্থিতে শান্ত থাকার অনুপ্রেরণা তিনি। তিনি এমন এক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে গিয়েছেন যেখানে দুনিয়াবী কোন স্বার্থ পাওয়া যায়না। যে দেশে রাজনীতি একটি লাভজনক ব্যবসা সে দেশে তিনি মানুষকে পকেট থেকে টাকা বের করে সমাজের উপকার করার রাজনীতি শিখিয়েছেন। তিল তিল করে কঠিন সময়গুলো পার করে আজ এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। অধ্যাপক গোলাম আযম একটি নাম, একটি ইতিহাস। তিনি বিশ্বনন্দিত ইসলামী চিন্তাবিদ, ভাষা আন্দোলনের নেতা, ডাকসুর সাবেক জিএস, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপকার। বাংলাদেশের মাটি, আলো, বাতাস এবং মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে আছে তার জীবন, তার সংগ্রাম। স্বেচ্ছায় দলীয় প্রধানের পদ থেকে সরে যাওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন তার মতো ব্যক্তির পক্ষেই দেয়া সম্ভব হয়েছে। ৫ম বারের মতো জেলে যাওয়ার আগে গণমাধ্যমের সামনে তিনি যে বলিষ্ঠ সাক্ষাতকার দিয়ে গেছেন তা ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রেরণার বাতিঘর হিসেবেই দেখছেন সকলে। তার চিন্তা চেতনা আর সাহসিকতা আর বলিষ্ঠতা এদেশের ছাত্র যুব সমাজ তথা ইসলাম প্রিয় মানুষের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে। তার অমর কৃতির জন্য তিনি চির অমর হয়ে থাকবেন। জন্ম: অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯২২ সালের ৭ই নভেম্বর মঙ্গলবার (বাংলা ১৩২৯ সালের ৫ই অগ্রহায়ণ) ঢাকা শহরের লক্ষ্মীবাজারস্থ বিখ্যাত দ্বীনী পরিবার শাহ সাহেব বাড়ী (মিঞা সাহেবের ময়দান নামে পরিচিত) মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতামহ মাওলানা আব্দুস সোবহান। তাদের আদি নিবাস ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নবীনগর উপজেলার বীরগাঁও গ্রামে। ইউনিয়নের নামও বীরগাঁও। অধ্যাপক গোলাম আযমের পিতা ১৯৪৮ সালে ঢাকা মহানগরীতে রমনা থানার পূর্ব দিকে মগবাজার এলাকায় জমি কেনার পর ঢাকাতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। অধ্যাপক আযমের পূর্ব পূরুষগণ কমপক্ষে সাত পুরুষ যাবত ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নবীনগর উপজেলার বীরগাঁওয়ের বাসিন্দা। মাতুল বংশের দিক থেকে অধ্যাপক গোলাম আযম ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শাহ সাহেব পরিবারের সাথে সম্পর্কিত। তার মাতামহ ছিলেন মরহুম শাহ্ সৈয়দ আব্দুল মোনয়েম। প্রপিতামহ শাইখ মাহাবুদ্দিন। শাইখ শাহাবুদ্দিন একজন বড় আলেম এবং বুযুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। অধ্যাপক আযমের দাদা মাওলানা আব্দুস সোবহান একজন বিখ্যাত আলেম ছিলেন। তার সম্পর্কে প্রচলিত ছিলো যে, মেঘনার পূর্ব পারে অতবড় আলেম তখন কমই ছিল। ঢাকার মোহসিনিয়া মাদ্রাসা থেকে ডিগ্রী নেয়ার পর গোলাম আযমের পিতা গোলাম কবির ১৯২১ সালে এন্ট্রান্স পাস করেন। এন্ট্রান্স পাসের পর মাওলানা গোলাম কবির হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। অধ্যাপক আযমের দাদা মাওলানা আব্দুস সোবহানও ঢাকার মোহসিনিয়া মাদ্রাসায় পড়াশুনা করেন এবং পরে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তী সময়ে গভর্নমেন্ট ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে পরিণত হয় এবং গোলাম আযম সেই কলেজেই শিক্ষা লাভ করেন। শিক্ষা ও ক্যারিয়ার: গোলাম আযম ১৯৩৭ সালে জুনিয়ার মাদ্রাসা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে কৃতিত্বেও সাথে উত্তীর্ণ হন। এসএসসি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় গোলাম আযম ত্রয়োদশ স্থান লাভ করেন। ১৯৪৪ সালে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকেই আইএ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে ঢাকা বোর্ডে দশম স্থান অধিকার করেন। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের কাজে জড়িয়ে পড়ায় গোলাম আযম পরীক্ষা দিতে পারেননি এবং ১৯৪৯ সালে দাঙ্গাজনিত উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠান সম্ভব হয়নি। ফলে তিনি ১৯৫০ সালে এম. এ পরীক্ষা দেন। ঐ বছর কেউ প্রথম বিভাগ পায়নি। চারজন ছাত্র উচ্চতর দ্বিতীয় বিভাগ লাভ করেন এবং অধ্যাপক গোলাম আযম তাদের মধ্যে একজন। ১৯৫০ সালের ৩রা ডিসেম্বর তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। কর্মজীবনের সূচনা হলো। তিনি ১৯৫০ সালর ৩রা ডিসেম্বর থেকে ১৯৫৫ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবে রংপুর কারমাইকেল কলেজে কর্মরত ছিলেন। নিজ বিভাগের ছাত্ররা ছাড়াও তার লেকচারের সময় অন্যান্য ক্লাসের ছাত্ররা তার ক্লাসে যোগদান করতো। ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন: ছাত্রজীবন শেষে অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯৫০ সালেই তাবলীগ জামায়াতের তৎপরতার সাথে জড়িত হন। ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি তাবলীগ জামায়াতের রংপুরের আমীর ছিলেন। তাবলীগ জামায়াত যেহেতু ধর্মীয় প্রচার ও মিশনারী দায়িত্ব পালন করছিলো তাই তিনি শুধুমাত্র তাবলীগ জামায়াতের কাজ করেই তৃপ্তি পাননি। সুনির্দিষ্ট কোন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মসূচী তাবলীগ জামায়াতের ছিল না। তমদ্দুন মজলিসের কার্যক্রমে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা ও তার সমাধান সম্পর্কে বক্তব্য থাকায় জনাব গোলাম আযম তমদ্দুন মজলিসের কাজেও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হয়ে পড়েন ১৯৫২ সালেই। ১৯৫৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি তমদ্দুন মজলিসের রংপুর জেলার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সালের এপ্রিলে জামায়াতে ইসলামীতে সহযোগী (মুত্তাফিক) হিসেবে যোগদান করার পর ১৯৫৫ সালে গ্রেফতার হয়ে রংপুর কারাগারে অবস্থানকালেই জামায়াতের রুকন হন। ১৯৫৫ সালের জুন মাসে তিনি রাজশাহী বিভাগীয় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। এর এক বছর পর তাকে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি এবং রাজশাহী বিভাগীয় জামায়াতের আমীরের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯-১৯৭১ সেশনে তিনি জামায়াতে ইসলামী পূর্ব-পাকিস্তানের আমীর নির্বাচিত হন। ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে মজলিসে শূরার কাছে বিশেষ আবেদনের প্রেক্ষিতে আমীরে জামায়াত-এর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করেন। রাজনৈতিক আন্দোলন: স্বৈরাচারী ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে জামায়াত সর্বদাই সোচ্চার ছিলো। জামায়াতের অন্যতম নেতা হিসেবে এবং বিশেষভাবে রাজনৈতিক দিক থেকে উত্তপ্ত সাবেক পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমীর হিসেবে অধ্যাপক গোলাম আযম বিরোধী দলীয় আন্দোলনে একজন প্রথম সারির নেতার ভূমিকা পালন করেছেন। আইয়ূব খানের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিটি আন্দোলনে অধ্যাপক গোলাম আযম অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালের ২০শে জুলাই ঢাকায় খাজা নাজিমুদ্দিনের বাসভবনে মুসলিম লীগ (কাউন্সিল), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, আওয়ামী লীগ, নেজামে ইসলাম ও নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিবৃন্দ ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য চার দিনব্যাপী বৈঠকে নয় দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে সম্মিলিত বিরোধী দল Combined Oppositeon Partics (COP) গঠন করা হয়। সম্মিলিত বিরোধী দলের তৎপরতা পরিচালনায় অধ্যাপক গোলাম আযম বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। পিডিএম আট দফা কর্মসুচি ঘোষণা করে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের জনাব আব্দুস সালাম খানকে সভাপতি এবং অধ্যাপক গোলাম আযমকে জেনারেল সেক্রেটারি করে পূর্বাঞ্চলীয় পিডিএম কমিটি গঠিত হয়। পিডিএম-এর পূর্বাঞ্চলীয় জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে অধ্যাপক গোলাম আযম দিনরাত পরিশ্রম করেন এবং গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৬৯ সালের সরকার বিরোধী আন্দোলন জানুয়ারি মাসে সতুন পর্যায়ে প্রবেশ করায় দেশব্যাপী এক প্রচন্ড গণজাগরণের সূচনা হয়। নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খানকে ডাক-এর আহ্বায়ক নির্বাচিত করা হয়। গণআন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান গোল টেবিল বৈঠকে যোগদান করার জন্য ডাক-এর ৮টি অঙ্গদলের দু’জন করে প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানান। যাদের আমন্ত্রণ জানানো হয় তারা হলেন- কাউন্সিল মুসলিম লীগের মমতাজ দৌলতানা এবং খাজা খায়েরুদ্দিন, জামায়াতে ইসলামীর সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী ও অধ্যাপক গোলাম আযম, পাকিস্তান আওয়ামী লীগের (৬ দফা) শেখ মুজিবুর রহমান ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের মুফতি সাহমুদ ও পীর মোহসেন উদ্দিন, পাকিস্তান আওয়ামী লীগের (৮ দফা) নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান ও আব্দুস সালাম খান, নেজামে ইসলামের চৌধুরী মোহাম্মদ আলী ও মৌলভী ফরিদ আহমদ, ন্যাপের আব্দুল ওয়ালী খান ও অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। এ ছাড়াও পাকিস্তানের পিপল্স পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ন্যাপ (ভাসানীর) মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এয়ার মার্শাল আসগর খান, লেঃ জেনারেল মুহম্মদ আযম খান ও প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ বৈঠকে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। ২৬শে ফেব্রুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে সকাল সাড়ে দশটায় প্রেসিডেন্ট গেস্ট হাউজে ডাক-এর ষোলজন প্রতিনিধি, প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের নেতৃত্বে ১৫ জন, নির্দলীয় এয়ার মার্শাল আসগর খান, বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ রাজনৈতিক সংকট উত্তরণকল্পে গোল টেবিল বৈঠকে মিলিত হন। ৪০ মিনিট ব্যাপী বৈঠকের পর ঈদুল আযহা উপলক্ষে বৈঠক ১০ মার্চ সকাল ১০ টা পর্যন্ত মূলতবি রাখা হয়। ১০ই মার্চ হতে ১৩ই মার্চ পর্যন্ত রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট গেস্ট হাউজে গোল টেবিল বৈঠকে বসে এবং ১৩ই মার্চ গোল টেবিল বৈঠকের সমাপ্তি অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খান নিম্নোক্ত দাবী দুটি গ্রহণ করেন, প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচন এবং ফেডারেল পার্লামেন্টারী সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন। অধ্যাপক গোলাম আযম এ বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিত্ব করেন। বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯৮০ সালে সর্বপ্রথম ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফর্মুলা’ উপস্থাপন করেন। ১৯৯৬ সালে তার পূর্বেকার প্রস্তাব মতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সংবিধানে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফর্মুলা’ সংযোজন করেন। ১৯৯৯ সালে ইসলাম ও জনগণের ইচ্ছার বিরোধী ভারতের তাঁবেদার আওয়ামী লীগ সরকারের উচ্ছেদের লক্ষ্যে গঠিত চারদলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন তিনি। লেখক ও চিন্তাবিদ গোলাম আযম: আন্দোলন এবং সাংগঠনিক কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও অধ্যাপক গোলাম আযম লেখা এবং চিন্তার জগতে তার অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। ১৯৫৮ সালে তিনি দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদনা বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব নেন। তিনি সম্পাদকীয়সহ বিভিন্ন কলামে নিয়মিত লিখতেন। তাফসীর, নবী জীবন, ইসলাম, সংগঠন, আন্দোলন, রাজনীতি ইত্যাদি নানা বিষয়ে এ পর্যন্ত ১০৭ টি বই লিখেছেন তিনি। অধ্যাপক গোলাম আযম লিখিত কিছু বই ইংরেজী ছাড়াও উর্দু, তামিল ও অহমিয়া ভাষায় অনুদিত হয়েছে। এ ছাড়া অধ্যাপক গোলাম আযমের জীবনী নিয়ে ইংরেজী ভাষায় একটিসহ ৮টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে ইসলামী ঐক্যের প্রচেষ্টা: ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর ইসলামী ঐক্য ইসলামী আন্দোলন’ পুস্তিকায় সকল ইসলামী শক্তিকে এক প্লাটফর্মে সমবেত হওয়ার রূপরেখা প্রদান করেন অধ্যাপক গোলাম আযম। ’৮১ সালের ডিসেম্বরে ঐ রূপরেখা অনুযায়ী ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’ নামক ব্যাপকভিত্তিক ঐক্যমঞ্চ গঠিত হয়। ১৯৯৪ সালে ইসলামী ঐক্যের অগ্রগতি সম্পর্কে ‘ইসলামী ঐক্য প্রচেষ্টা’ শিরোনামে পুস্তিকা রচিত হয়। ১৯৯৪ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকাস্থ আল ফালাহ মিলনায়তনে ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলনে ইসলামী ঐক্য গঠনের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী হাটহাজারী ও পটিয়া মাদ্রাসার মুহতামিমদ্বয়ের নিকট প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে মুহতামিমদ্বয় কর্তৃক চারদফা প্রস্তাব পেশ করেন। ১৯৯৬ সালে চারদফা প্রস্তাব গ্রহণ করে পত্রের উত্তর প্রদান। ১৯৯৭ সালে খুলনায় অনুষ্ঠিত ওলামা সম্মেলনে ইসলামী ঐক্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। ১৯৯৮ সালের জানুয়ারি মাসে গওহারডাঙ্গা মাদ্রাসার মুহতামিম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীরে শরীয়াত ও মহাসচিবের নিকট পত্র প্রেরণ করা হয়। ১৯৯৮ সালে ১৯৭৮ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত ২০ বছর ধরে ইসলামী ঐক্য প্রচেষ্টার ধারাবাহিক বিবরণ দিয়ে ‘ইসলামী ঐক্যমঞ্চ চাই’ নামক পুস্তিকা রচনা। বিদেশে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ: অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে World Association of Muslim Youth (ওয়ামী) কর্তৃক আহূত International Islamic youth Conference এর উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি Islamic Youth Conference at Tripoli, Annual Conference of Federation of Students Islamic Socities (Fosis), England, 11th Convention of Muslim Students Association of America held at Michigan University Annual Conference of U.K. Islamic Mission এ অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত International Federation of Students Organization-এর সভায় অতিথি বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৫ সালের মে মাসে তুরস্কে আয়োজিত রিফা পার্টির সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৫ সালের আগস্টে লন্ডনে ইসলামী সংস্থাগুলোর সম্মিলিত গণসম্বর্ধনায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসেIslamic Society of North America-এর উদ্যোগে বাল্টিমোরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে অতিথি বক্তা,Muslim Ummah in America-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৬ সালের অক্টোবর মাসে International Islamic Federation of Students Organization-এর উদ্যোগে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশেষ অতিথি এবং ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইসলামী সংস্থাগুলোর সম্মেলনে তুর্কি প্রধানমন্ত্রী ড. নাজমুদ্দীন আরবাকানের আমন্ত্রণে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারী মাসে Islamic Mission Japan-এর বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। জুলাই মাসে বাল্টিমোরে Islamic Circle of North America (ICNA) বার্ষিক কনভেনশনে আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথি ছিলেন। একই বছর আগষ্ট মাসে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত U.K. Islamic Mission হ সম্মেলনে অতিথি বক্তা এবং ইংল্যান্ডের শেফিল্ডে অনুষ্ঠিত U.K. Islamic Mission সম্মেলনে অতিথি বক্তা হিসেবে যোগদান করেন। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকার শিকাগোতে অনুষ্ঠিত Islamic Society of North America (ISNA) -এর বার্ষিক মহাসম্মেলনে অতিথি বক্তা এবং Muslim Ummah in America-এর উদ্যোগে আয়োজিত শিকাগো শাখার সম্মেলনে প্রধান বক্তা ছিলেন। অক্টোবরে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার শহরে অনুষ্ঠিত Islamic Forum Europe-এর সম্মেলনে প্রধান বক্তা, দাওয়াতুল ইসলাম ইউ.কে এন্ড আয়ার-এর উদ্যোগে আয়েজিত ২দিন ব্যাপী সম্মেলনে প্রধান বক্তা এবং নভেম্বরে দুবাই সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত আন্তর্জাতিক কুরআন পুরস্কার পরিষদের সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে যোগদান করেন। পাঁচবারের কারাবরণ: নির্ভীক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মজলুম জননেতা অধ্যাপক গোলাম আযম। শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণেই ৫ম বারের মতো কারাগারে গেলেন বর্ষীয়ান জননেতা, ভাষা সৈনিক জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম। এর আগে ভাষা আন্দোলনের জন্য ১৯৫২ ও ১৯৫৫ সালে দুইবার, ১৯৬৪ সালে স্বৈরাচারী আইয়ুবের আমলে একবার, ১৯৯২ সালে নাগরিকত্ব প্রসঙ্গে একবার আর সর্বশেষ গত ২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আদেশে কারাবরণ করেন এই নেতা। প্রিজন সেলে থাকা অবস্থায়ই তিনি ইন্তিকাল করেন। ২০১১ সালের ২২ ডিসেম্বর এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই তার কারাবরণের কথা তুলে ধরেন। সে সময় তিনি বলেন, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় প্রথম আমি রংপুরে গ্রেফতার হই। ভাষা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ততার জন্যই আবারো ১৯৫৫ সালে আমি গ্রেফতার হই। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সরকার যখন জামায়াতে ইসলামীকে বেআইনী ঘোষণা করে। তখন আমি লাহোরে ছিলাম কেন্দ্রীয় শূরার সভার জন্য। সেখানে আমি আবারো গ্রেফতার হই। এর ২ মাস পর আমাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। এ সময় ৫ মাস আমি জেলে ছিলাম। একটা কথা আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই, তাহলো জেলে যাওয়ার পর প্রত্যেক বারই আমি উচ্চ আদালতে রিট করে মুক্ত হই। সর্বশেষ ১৯৯২ সালে আমাকে গ্রেফতার করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে আমার নাগরিকত্ব বাতিল করে। ১৯৯২ সালে বিএনপি আমাকে বিদেশী নাগরিক হিসেবে গ্রেফতার করে। এ সময় আমি ১৬ মাস জেলে ছিলাম। ১৯৯৩ সালের জুন মাসে বিদেশী নাগরিক হিসেবে যে মামলা করে সরকার, এতে তারা হেরে যায়। উচ্চ আদালতের নির্দেশে আমি মুক্ত হই। কিন্তু তখনও নাগরিকত্ব পুনর্বহালের মামলা বাকী ছিল। এ ব্যাপারে দুই বিচারক দুই রকম রায় দেন। এরপর তা তৃতীয় বিচারপতির কাছে গেলে তিনি আমার পক্ষে রায় দেন। সরকার এর বিরুদ্ধে আপিল করে। এক বছর পর ১৯৯৪ সালের ২২ জুন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ৫ জন বিচারপতির সমন্বয়ে পুর্ণাঙ্গ বেঞ্চে সর্বসম্মতিক্রমে আমার নাগরিকত্ব বহালের আদেশ দেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের অর্ডারকে বেআইনী ঘোষণা করেন। দীর্ঘ ২১ বছর পর আমি নাগরিকত্ব ফিরে পেলাম। সেই সাক্ষাৎকারেই আবারো জেলে যাওয়া প্রসঙ্গে বলেছিলেন, মু’মিনের জন্য নিয়ম হচ্ছে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারবে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি কাউকে ভালোবাসতে পারবে না। এটাই আল্লাহর নির্দেশ। আর ভয়, আল্লাহ ছাড়াতো কাউকে ভয় পাওয়া জায়েজই নেই। মু’মিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পেতে পারে না। আমি উদ্বিগ্ন নই। আমি মৃত্যুকে ভয় করি না। মৃত্যুকে ভয় পাবো কেন? মু’মিনতো মৃত্যু কামনা করে। কেননা মৃত্যুর পর আল্লাহর কাছে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। তাই মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যুদ্ধাপরাধ বিচারের নামে ওনাকে হত্যা করার পাঁয়তারার সময় গ্রেপ্তারের প্রাক্কালে সাংবাদিকরা যখন জিজ্ঞাসা করেছিল আপনার ভয় করছে না? তিনি জবাব দিলেন, তিনি জবাব দিলেন,ভয়? ভয় কিসের? ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে শাহাদাতের কামনা করেছি সারা জীবন…আর অন্যায়ভাবে যদি মৃত্যু দেয়া হয় শহীদ হওয়ার গৌরব পাওয়া যায়… আল্লাহকে ছাড়া কাউকে “ভয় করাতো জায়েজই নাই, আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করার অনুমতি নাই।” ২০১৪ সালে যখন খবর পেলাম আমাদের ইমাম আর নেই তখন নিজেকে ধরে রাখাটা খুব কষ্টকর হচ্ছিল। যদিও জানি সবাইকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। তারপরও যেন মানতে পারছিলাম না। বার বার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিলো না, কখনো না, গোলাম আযম মরতে পারেনা। এক অর্থে গোলাম আযমদের মৃত্যু নেই। তাঁরা শহীদ। শহীদের মৃত্যু হয়না। আমরা তা সহজে বুঝতে পারিনা। শুধু তাই নয়, আল্লাহ তায়ালা আরো বলেছেন শহীদেরা আল্লাহর পক্ষ থেকে রিযিক প্রাপ্ত হন। হে আল্লাহ, তুমি আমাদের ইমামকে শহীদ হিসেবে কবুল করে নাও।

শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী

শহীদ প্রোফাইল

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী

শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী একটি জীবন, একটি ইতিহাস। আল্লাহ প্রদত্ত এক বিস্ময়কর প্রতিভা। ব্যক্তিগত জীবনে স্বচ্ছ চিন্তা, সরল জীবন-যাপনে অভ্যস্ত, নরমদিল ও অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী, অত্যন্ত ভদ্র-নম্র, মার্জিত, পরিশীলিত, মৃদুভাষী এক অসাধারণ ইসলামী ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী শান্তি ও স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণের প্রিয় দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর এবং বাংলাদেশের প্রথম সারির রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞ আলেম, ইসলামী চিন্তাবিদ, সুলেখক, ইসলামপ্রিয় জনগণের রুহানি উস্তাদ ও বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ। ২০১৫ সালে আমেরিকার বিখ্যাত সংস্থা “দ্য রয়েল ইসলামিক স্টাডিজ সেন্টার” প্রকাশিত তালিকায় বিশ্বের ৫০০ প্রভাবশালী মুসলিম ব্যক্তিত্বের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে ২৮ অক্টোবরের কথা। ২০০৬ সালে পল্টনের সেই ভয়াল দিনে মাওলানা নিজামী যখন বক্তব্য রাখছিলেন তখন পল্টনে চলছিল যুদ্ধাবস্থা। তিনি ঠায় দাঁড়িয়ে শান্তভাবে তার বক্তব্য চালিয়ে গিয়েছেন। বার বার বলছিলেন শান্তভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে। নেতা কর্মীদের বার বার নির্দেশ দিচ্ছেন সবাই যাতে শান্ত থেকে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে। সেদিন জামায়াত-শিবিরের শত শত নেতাকর্মীরা হতাহত হলেও মাওলানা নিজামীর ধৈর্য্য ধরার কঠোর নির্দেশ তারা পালন করে। একজন নেতার কঠোর দূর্যোগ মুহুর্তেও ঠায় দাঁড়িয়ে ধৈর্য্যের উপদেশ দিতে পারার হিম্মত মাওলানা নিজামীকে না দেখলে বোধহয় আমাদের দেখার সুযোগ হতো না। মাওলানা নিজামী ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে তার ছাত্ররাজনীতি শুরু করেন। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান ছাত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। পরপর তিন বছর তিনি পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রআন্দোলনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর দুইবার তিনি গোটা পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মওলানা নিজামী ছাত্রজীবন শেষ করে বৃহৎ ইসলামী আন্দোলন জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। ১৯৭৮-১৯৮২ পর্যন্ত তিনি ঢাকা মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩-১৯৮৮ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং আমীর নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত (২০০০সাল) দায়িত্ব পালন করেন। ষাটের দশকে আইয়ুব সরকার বিরোধী আন্দোলন, ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের আন্দোলন, স্বৈরাচার বিরোধী ৯০ এর আন্দোলন, ৯৬ তে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রর্বতনের আন্দোলন সহ তিনি অন্যান্য সকল রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আপামর জনতার সাথে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর তিনি। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর নির্বাচিত হন ২০০১-২০০৩ এবং ২০০৪-২০০৬ সেশনে। তিনি ২০০৭-২০০৯ এবং ২০১০-২০১২ সেশনে পুনরায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর নির্বচিত হন। সুস্থ রাজনীতির চর্চাঃ বাংলাদেশের কলুষিত রাজনৈতিক চর্চায় গুণগত পরিবর্তন আনার জন্য তিনি চেষ্টা করেছেন শুরু থেকেই। ১৯৯১ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে তার দেয়া বক্তব্য তিনি রাজনীতিতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের কেমন আচরণ কেমন হওয়া উচিত এই বিষয়ে এই বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রথমে সরকারি দলকে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন শিক্ষণীয় ভূমিকা নিতে হবে তাদেরকেই। জাতি এটাই কামনা করে। পরমত সহিষ্ণুতা দেখাতে হবে। বিরোধী দলের সমালোচনা সহ্য করার অনুরোধ করেন। সেই সাথে তিনি বিরোধী দলের ব্যাপারে বলেন, “জাতি বিরোধীদলের ভূমিকাকেও গঠনমূলক দেখতে চায়। আবেগ নির্ভর হয়ে নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে গিয়ে যাতে পরিবেশ ক্ষুন্ন না হয় সে দিকে খেয়াল রাখা দরকার। অপজিশনের খাতিরে অপজিশন, বিরোধীতার খাতিরে বিরোধীতা যাতে না করে”। তিনি আরো বলেন, “অতীতের ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। যে জাতি অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না সত্যিকার অর্থে সে জাতি তার ভবিষ্যতকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করতে পারেনা। কিন্তু ইতিহাসের আলোচনা শিক্ষাগ্রহনের উদ্দেশ্যেই হওয়া উচিত। কোন তিক্ততা সৃষ্টির জন্য অতীতের ইতিহাসের আলোচনা হলে যদি পরিবেশ বিঘ্নিত হয় সে ধরণের আলোচনা যেন আমরা সকলেই পরিহার করি”। ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রচেষ্টাঃ মাওলানা নিজামী সবসময় ইসলামপ্রিয় দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছেন। তিনি তার বিভিন্ন বক্তব্যে বলেন, “জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এদেশের সকল ইসলামী দলকে আপন মনে করে, অন্তর থেকে তাদেরকে শ্রদ্ধা করে। আমি এতটুকু বলতে চাই, ভুল বুঝাবুঝির কারণে হোক বা যে কারণেই হোক জামায়াত ইসলামীর বিরুদ্ধে যারা সমালোচনা করেন তাদের বিরুদ্ধেও আমরা কোন কথা বলি না বলবো না। সমালোচনায় জড়িয়ে পড়ে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির মত পরিস্থিতিতে জামায়াত ইসলামী আজ পর্যন্ত শরিক হয়নি। ভবিষ্যতেও হবেনা। আজকের এই সময়টি ইখতিলাফ নিয়ে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ার সময় নয়। ইসলামে মতপার্থক্য ছিল, আছে এবং থাকবে। যে যেমতে বিশ্বাসী তাকে সে মতে থাকতে দিন। জোর করে একজনের মতের উপর আরেকজনের মত চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেই সেখানে ফিতনা ফাসাদের জন্ম হতে পারে। জামায়াতে প্রথম থেকেই এই ব্যাপারে সজাগ আছে, সজাগ থাকবে”। “আমরা বিশ্বাস করি, যারা কুরআন হাদীসের খেদমতে নিয়োজিত তারা যদি আমাদের বিরুদ্ধে ফতোয়াও দেন তবুও তারা যে কাজটি করছে সে কাজটি আমাদের কাজ। তারা হয়তো কোন ভুল তথ্য পেয়ে আমাদের বিরুদ্ধে নেগেটিভ কথা বলছে কিন্তু তারা যেহেতু আমাদেরই কাজ করছে তাই তাদের বুকে টেনে নেয়ার মত উদার আমাদের হতে হবে”। মাওলানা নিজামীর স্বভাবসুলভ বিনয়ঃ তিনি একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও কখনোই কাউকে ধমক দেয়া, বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতি অসম্মান কিংবা কোন প্রকার কটুক্তি করেননি। অথচ বিরোধী দলের প্রতি কটুক্তি করা বাংলাদেশের খুবই প্রচলিত আচরণ। স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে তিনি সমালোচনার জবাব দিতেন। সংসদে কারো বক্তব্যের বিরোধীতা করার প্রয়োজন হলে অথবা প্রতিবাদ জানানোর দরকার হলে তিনি তা করতেন অত্যন্ত সম্মানের সাথে। ওলামা মাশায়েখদের এক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেয়ার সময় তার বিনয় আমাদের কাছে আরো সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। তিনি ইসলামিক দলের প্রধান হওয়া সত্ত্বেও বলেন “এখানে যারা আসছেন তারা সবাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক অথবা মসজিদের ইমাম এবং খতিবের দায়িত্ব পালন করছেন। আমি নিজে শিক্ষক নই, কোন মসজিদের ইমাম নই খতীব নই। আমি ছাত্র এবং মুক্তাদী। সুতরাং সমস্ত ওলামায়ে কেরামকে আমি আমার ওস্তাদতুল্য মনে করি সম্মান করি। আমি আপনাদের ইমাম ও খতীব হিসেবে শ্রদ্ধা করি”। এভাবে সব দল মত পেশার মানুষকে তিনি সম্মান করতেন। কথা বলতেন অত্যন্ত বিনয়ের সাথে। বাবরী মসজিদ প্রসঙ্গে মাওলানাঃ ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর উপমহাদেশের অত্যন্ত প্রাচীন বাবরী মসজিদ ভেংগে দেয়া হয়। ভারতে বাবরী মসজিদ ভাংগার প্রতিবাদে সারা দুনিয়াব্যাপী মুসলমানরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। মসজিদ ভাংগার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তৌহিদী জনতার পক্ষ থেকে এদেশের বৃহত্তম ইসলামী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ৫ম জাতীয় সংসদে বাবরী মসজিদের উপর আলোচনার জন্য প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। প্রথমে সরকারী দল ও বিরোধী দল আলোচনার প্রস্তাবে রাজী হয়নি। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের চাপে অবশেষে সংসদে বাবরী মসজিদ প্রসংগ আলাচনার জন্য উপস্থাপিত হয়। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বাংলাদেশের তৌহিদী জনতার পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদে বাবরী মসজিদ প্রসংগে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। মাওলানা নিজামী মসজিদ ভাংগার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জ্ঞাপন করে বলেন, বাবরি মসজিদ নিছক একটি মসজিদ নয়, ইসলামী আদর্শের, ইতিহাস, ঐতিহ্যের এবং সভ্যতার একটি বিরল প্রতীক এটি। তাই বাবরী মসজিদ ধ্বংস করে দেয়া সাধারণ কোন ব্যাপার নয়। এটাকে বিবেচনা করতে হবে আদর্শের উপর আঘাত, ইতিহাসের উপর আঘাত, একটি সভ্যতার উপর আঘাত, একটি ঐতিহ্যের উপরে আঘাত হিসাবে। গোটা বিশ্ব আজ এই কার্যক্রমের নিন্দা করছে। বাংলাদেশের দলমত নির্বিশেষে ১২ কোটি মানুষ এর নিন্দা করছে। সেই ১২ কোটি মানুষের এই সংসদ এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি নিন্দা প্রস্তাব নেবে এটাই জাতির প্রত্যাশা। মাওলানা নিজামী ভারতীয় মুসলমানদের নিরাপত্তা বিধান ও মুসলিম জাতিসত্ত্বা বিনাশের চক্রান্ত রুখে দাড়ানোর আহবান জানিয়ে জাতীয় সংসদে তার বক্তব্যে বলেন, “বাবরী মসজিদের ঘটনা নিছক একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর সাথে আরো অনেক কিছু জড়িত আছে। আমি মনে করি, শুরু থেকে সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদের অনুসারী বর্ণ হিন্দুবাদের যে রাজনৈতিক লক্ষ্য দৃষ্ট হচ্ছে এ বাবরী মসজিদ ভাংগা তারই একটা প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। বাবরী মসজিদ ভাংগার তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হচ্ছে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বানচাল করা এবং সার্ককে অকার্যকর করা। কারণ সার্ক এর অস্তিত্ব ভারতের আধিপত্যবাদী, আগ্রাসী ও সম্প্রসারণবাদী চরিত্র তথা মানসিকতার পথে একটা বড় বাধা। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশগুলো একত্রিত হয়ে ভারতের পাশাপাশি এক টেবিলে বসার সুযোগ আধিপত্যবাদী মানসিকতা চিরতার্থ করার পথে একটি বড় অন্তবায়। তাই ভারত সার্ককে মন থেকে চায় না”। মাওলানা নিজামী জাতীয় সংসদে প্রদত্ত ভাষণে ভারতের মুসলিম জাতিসত্ত্বা ধ্বংসের সর্বনাশা পরিকল্পনা, আওয়ামী লীগ কর্তৃক সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল ও আওয়ামী লীগের ভারতপ্রীতির সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। ফারাক্কা সমস্যা নিয়ে সংসদে আলোচনা: ফারাক্কা বাংলাদেশের ১৪ কোটি মানুষের জন্য জীবন মরণ সমস্যা। ফারাক্কা ইস্যু নিয়ে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন করে আসছে। জাতীয় সংসদে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামীর ২০ জন এম পি একযোগে দাড়িয়ে ফারাক্কা সমস্যা নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনার জন্য স্পীকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। স্পীকার জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের দাবীর প্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে ফারাক্কা ইস্যু নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করেন। মাওলানা নিজামী ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়া জাতীয় সংসদে তুলে ধরে এ সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক ফোরামে তোলার দাবী জানান। তিনি জাতীয় সংসদে তার বক্তব্যে বলেন, মাননীয় স্পীকার, ফারাক্কার কারণে যে সেচ অসুবিধা হয় তাতে প্রায় ৩ লক্ষ একর জমি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। আদ্রতা হ্রাসের কারণে ৩০লক্ষ একর জমি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, লবনাক্ততার কারণে ৬৪ লক্ষ একর জমি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এই ক্ষতিপূরণ আদায় করার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার অধিকার আমাদের আছে। আমেরিকা মেক্সিকোর তুলনায় অনেক বড় দেশ, একটি মহাদেশ। কিন্তু কলোরাডা নদীর পানির উপর আমেরিকার যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে এর ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল। সুতরাং এ ব্যাপারে ঐক্যমতে আসা দরকার। সেই সাথে বিকল্প বাধের ব্যাপারে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। বসনিয়া পরিস্থিতিতে উদ্বেগ: মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী জাতীয় সংসেদ বসনিয়া-হারজেগোভিনা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য জাতীয় সংসদের স্পীকারের প্রতি নোটিশ প্রদান করেন। পার্লামেন্টের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর এই প্রথম সার্ববাহিনীর বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়। মোট এক ঘন্টার আলোচনার মধ্যে মাওলানা নিজামী জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে একাই আধঘন্টা আলোচনা করেন। তার এ আলোচনা জাতীয় সংসদে উপস্থিত সকল সদস্যের আবেগ ও অনুভূতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মজলুম মাবনতার পক্ষে নিজামীর আবেগময় বক্তব্য জাতীয় সংসদের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষারে লেখা থাকবে। পুশব্যাক: ভারত সরকার মুসলিম নাগরিকদের বাংলাদেশে পুশব্যাকের পদক্ষেপ গ্রহণ করলে জননেতা নিজামী জাতীয় সংসদে ভারত সরকারের এ ঘৃণ্য পদক্ষেপের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। তিনি তার বক্তব্যে ভারতের পুশব্যাককে পুশইন বলে আখ্যায়িত করেন। মাওলানা নিজামীর এ পুশইন জাতীয় সংসদে সকলের সমর্থন লাভ করে। ফলে ভারতীয় চক্রান্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ফাজিল ও কামিল-এর ডিগ্রী ও মাস্টার্স এর সমমান প্রদান ভূমিকা: বহুদিন ধরেই এদেশে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যাবস্থা ছিল অবহেলিত। সরকারিভাবে এখান থেকে নেয়া ডিগ্রীর মান দেয়া হতো না। এর প্রভাবে এদেশে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কারণ মাদ্রাসা ছাত্রদের সার্টিফিকেটের মূল্য না থাকায় সরকারি চাকুরিসহ নানা চাকুরিতে বৈষম্যের শিকার হতে হতো। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য মাওলানা নিজামী ফাজিল-কামিলকে ডিগ্রী ও মাস্টার্স-এর সমমান প্রদান আন্দোলনে ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন। মন্ত্রী থাকা অবস্থায় মন্ত্রীসভার এ সংক্রান্ত কমিটিতে তিনি অগ্রণী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০০৬ সালে এ কমিটিতে ফাজিল ও কামিলকে যথাক্রমে ডিগ্রী ও মাস্টার্সের সমমান প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, মন্ত্রীসভায় তা পাস হয় এবং জাতীয় সংসদে তা অনুমোদিত হয়। টিপাইমুখ নিয়ে মাওলানার ভূমিকা: সিলেটের জকিগঞ্জ হতে ১০০ কিলোমিটার উজানে ভারতের মনিপুর রাজ্যে টিপাইমুখ ড্যাম নির্মাণ করছে ভারত। সুরমা-কুশিয়ারা ও মেঘনা নদীর পানি আসে এই পথে। এটি ৯৩০ মি দীর্ঘ ও ৯৬৯ মি উচু একটি বাঁধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি হবে আরেক ফারাক্কা বাঁধ। এ বাঁধ হলে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও নারায়ণগঞ্জ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, গ্রীস্মকালে ৯৪৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকা মরুভূমির ন্যায় শুকনো থাকবে, বর্ষাকালে হঠাৎ পানি ছাড়লে ব্যাপক বন্যা হবে, প্রায় ৫ কোটি মানুষ ক্ষতিকর প্রভাবের স্বীকার হবে, ভূমিকম্পের আশঙ্কা বাড়বে, খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে এবং শতাধিক নদী মরে যাবে। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। সিলেটে টিপাইমুখ অভিমুখে নৌমার্চ, ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় মহাসমাবেশ করে জামায়াতে ইসলামী। পল্টনে টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে আয়োজিত সমাবেশে মাওলানা নিজামী বলেন, জামায়াতে ইসলামী কোন ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়। কোন বিশেষ দেশের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জামায়াতে ইসলামী অন্যায় অসত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ইসলামের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র হলে সেই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। আর প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বাংলাদেশের কোন স্বার্থ বিরোধী কর্মকান্ডে রুখে দাঁড়াতে অভ্যস্ত। সাউথ এশিয়ান টাস্কফোর্স, টিকফা, ট্রানজিট বিরোধীতায় তিনি ছিলেন সরব। “টিপাইমুখ বাঁধের কারণে পারমানবিক বিস্ফোরণের মতই ক্ষতিগ্রস্থ হবে বাংলাদেশ। টিপাইমুখে বাঁধ দিলে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনা নদী মরে যাবে। ফারাক্কার ক্ষতি সমূহের কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের অহংকার পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। এক ফারাক্কার কারণে পদ্মা- যমুনা মরে গেছে। এখন মেঘনা যদি মরে যায় বাংলাদেশ মরুভূমি হয়ে যাবে। বাংলাদেশকে ভাতে ও পানিতে মারার ষড়যন্ত্র হচ্ছে টিপাইমুখ বাঁধ”। তিনি সরকারকে আহবান করেন টিপাইমুখ নিয়ে জাতীয় ঐক্য গঠন করতে। অযথা সরকারের সমালোচনা না করে তিনি বলেছেন সরকার যদি টিপাইমুখের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তাহলে আমরা সরকারের হাতকে শক্তিশালী করবো। মাওলানা নিজামীর নেতৃত্বে সকল বিভাগীয় শহরে জামায়াত টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে জনসমাবেশের আয়োজন করে এবং জনগণকে সচেতন করে। জামায়াতে ইসলামীর দেশব্যাপী প্রচারণায় এটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়। এরপর আওয়ামী লীগ ছাড়া সর্বমহল থেকে এ বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের উঠে। অথচ সরকার এদিকে তো কর্ণপাত করেনি বরং সরকারের তৎকালীন পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন বলেন, আগে বাঁধ হোক, পরে দেখা যাবে। ইসলাম বিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এক সোচ্চার কন্ঠঃ জঙ্গীবাদের নামে ইসলামকে কলুষিত করার জঘন্য ষড়যন্ত্র নিয়ে তিনি সারাজীবন কথা বলেছেন। এটাকে বিদেশী ষড়যন্ত্র উল্লেখ করে তিনি বলেছেন বিদেশী শক্তি অনুপ্রবেশের জন্য এবং বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্র বানানোর জন্যই এতসব আয়োজন। জেএমবি নির্মূলে জোট সরকারের ভূমিকা উল্লেখ করে বলেন “পৃথিবীতে একমাত্র রাষ্ট্র বাংলাদেশই জঙ্গী নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে। আর এই সক্ষম হওয়ার পিছনে সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রেখেছেন এদেশের আলেম সমাজ। এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সরকারকে সহযোগিতা করেছেন ওলামায়ে কেরাম। তারা প্রতিটি মসজিদ থেকে এই আওয়াজ তুলেছেন এই জঙ্গিবাদের সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। এতে যারা বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছিলেন তারা মনস্তাত্ত্বিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়েছে এবং তাদের জঘন্য ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়”। মাওলানা নিজামী ইসলাম বিরোধী শক্তিদের ষড়যন্ত্র নিয়ে সবসময় সতর্ক করে গেছেন। ইসলাম বিরোধীরা ইসলামের মধ্যে বিভক্তির চেষ্টা করেছে। রাজনৈতিক ইসলাম এবং আধ্যাত্মিক ইসলাম বলে মুসলমানদের আলাদা করার প্রয়াস চালিয়েছে। আধ্যাত্মিক ইসলামকে প্রমোট করার মাধ্যমে যারা ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে প্রচারণা চালিয়েছে। পীর-মুরিদ তাসাউফ চর্চাই মূলত ইসলাম অন্য কিছু ইসলাম বহির্ভুত। ইসলামে রাজনীতি বলে কিছু নেই। এই ধরণের অপপ্রচার থেকে বেঁচে থাকার পরামর্শ তিনি সবসময় দিয়েছেন। কৃষি মন্ত্রনালয়ে অবদান: বাংলাদেশ উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের শতকরা পচাশি জন লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। তাই মাওলানা নিজামী কৃষি মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব নিয়েই কৃষকদের জন্য কাজ করার ব্যাপারে মনযোগী হন। ফসলের ন্যায্য পাওনা, উন্নত বীজ, সার, কীটনাশকসহ যাবতীয় কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতার উপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাদের যাবতীয় সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং এর সুষ্ঠু সমাধানকল্পে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এলক্ষ্যে তিনি মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক সফরের মাধ্যমে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী, বিজ্ঞানী ও কৃষকদের মাঝে প্রানচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনেন। মাওলানা নিজামী কৃষি মন্ত্রনালয় দায়িত্ব পালনকালে “চাষীর বাড়ী, বাগান বাড়ী” শ্লোগানকে দেশব্যাপী জনপ্রিয় শ্লোগানে পরিনত করেন। তার একান্ত প্রচেষ্টায় দেশের প্রতিটি চাষীর বাড়িকে এক একটি বাগান বাড়ি হিসাবে গড়ে তুলে নিজেদের পুষ্টি চাহিদা পূরন বাড়তি উপার্জন এবং স্বাবলম্বিতা অর্জন সহজ হয়েছে। মাওলানা নিজামীর ব্যক্তিগত অভিপ্রায়ে দেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় বৃক্ষ রোপন অভিযানে পৃথকভাবে ফলজ বৃক্ষ রোপন কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। এরপর থেকে আলাদাভাবে ফলজ বৃক্ষ রোপন কর্মসূচি উদযাপন করা হয়। সরকারের একজন মন্ত্রী হিসাবে তিনি নিজে বিভিন্ন জায়গায় বৃক্ষরোপন করেন এবং অন্যানের মধ্যে বৃক্ষের চারা বিতরণ করে বৃক্ষরোপনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধির প্রয়াস চালিয়েছেন। শুধু তাই নয়, নিজে উদ্যোগী হয়ে বিভিন্ন ফল চাষ প্রকল্প ঘুরে ঘুরে দেখেছেন, জনগণকে উৎসাহ যুগিয়েছেন এবং দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। তাই ধানের ফলন বৃদ্ধি এবং সঠিক সংরক্ষনের দিকে ছিল তার সতর্ক দৃষ্টি। ধানের প্রধান দুই শক্র ইদুর এবং কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রনে তার মন্ত্রনালয়ের পদক্ষেপ সত্যিই প্রশংসা করার মত। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা সম্মেলনে তার ছিল সরব ভূমিকা। বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের সকল ক্ষেত্রেই রয়েছে মাওলানা নিজামীর সুপরিকল্পিত নির্দেশনার ছাপ। আখ, পাট, তুলা, ভূট্টা, মধু এমনকি শীতকালীন শাকসবজি পর্যন্ত তার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। উৎপাদিত কৃষি পণ্যের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টি এবং কৃষকদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব সৃষ্টির লক্ষ্যে আয়োজন করা হয় কৃষি মেলার। এ ক্ষেত্রেও মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মাওলানা নিজামীর আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। তার দিক নির্দেশনায় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম রাজশাহী, নওগা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ছাড়িয়ে উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলায়ও সম্প্রসারিত হয়েছে। দেশের কৃষি উন্নয়নে মাওলানা নিজামীর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো হলো বি এ ডি সি বীজ উইং শক্তিশালী করণ, মাটিরগুনগত মান পরীক্ষাকরণ, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম পর্যালোচনা, কৃষিবিদ কৃষিবিজ্ঞানীদের যথাযথ পদোন্নতি এবং ব্লক সুপারভাইজার পদবী পরিবর্তন করে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পদ চালু। শিল্প মন্ত্রনালয়ে অবদান: বিগত ২০০৩ সালে ২৫শে মে কৃষি মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব থেকে মাওলানা নিজামীকে শিল্প মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব অর্পন করা হয়। উদ্দেশ্য ভেঙে পড়া বিপর্যস্ত রাষ্ট্রীয় শিল্পখাতকে পুনরুজ্জীবিত গতিশীল ও শৃংখলা ফিরিয়ে আনা। দায়িত্ব নিয়েই মাওলানা নিজামী দেশের শিল্পক্ষেত্রে নতুন গতিসঞ্চারের প্রয়াস পান। বাংলাদেশের শিল্পখাতের সমস্যাগুলো তিনি তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। এ সমস্যা দূরীকরণকল্পে তিনি দেশব্যাপী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের দ্রুত বিকাশের লক্ষে পৃথক শিল্পনীতি প্রনয়ন করেন। এ নীতি প্রনয়নকালে বেসরকারী খাতের উদ্যোক্তা ও সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী, সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞদের সাথে মত বিনিময় করা হয়। নতুন শিল্পনীতি ২০০৫ সালে ৩২টি শিল্পকে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর হিসাবে চিহ্নিত করে সেগুলোর মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। দেশের সামগ্রিক শিল্পখাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে সার্বিক দিক নির্দেশনা প্রদানের জন্য মাননীয় শিল্পমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি দিকনির্দেশনা কমিটিও গঠন করা হয়। প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর এ কমিটি বৈঠকে মিলিত হয়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতে বিরাজমান সমস্যা সমাধানকল্পে বাস্তবসম্মত কর্মপন্থা ও সুপারিশমালা প্রনয়নের কাজ করে চলেছে। ২০০১-০২ অর্থ বছরে যেখানে জিডিপিতে শিল্পখাতের অবদান ছিল ১৫.৭৬% ভাগ, সেখানে ২০০৪-০৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাড়িয়েছিল ১৬.৫৮% ভগে। একই বছরে শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.৪৪% ভাগ যা ২০০৫ সালে এসে দাড়িয়েছিল ৭.৪৮% ভাগে। এ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার যোগ্য নেতৃত্বে দেশের শিল্পভিত্তি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মাওলানা নিজামীর দায়িত্বাধীন শিল্পমন্ত্রনালয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যা দেশের শিল্পাঙ্গনে নতুন প্রান স্পন্দন সৃষ্টি করেছিল। দেশে মিশ্রসারের চাহিদা মেটাতে চট্টগ্রামে দৈনিক ৮০০মে: টন উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন ডাই-এ্যামোনিয়াম ফসফেট ডিপিএ-১ ও ডাই-এ্যামোনিয়াম ফসফেট ডিপিএ-২ নামে দুইটি নতুন সার কারখানা স্থাপন করা হয়। বিভিন্ন কর্পোরেশনের আওতায় সম্ভাবনাময় বন্ধ শিল্পসমূহ পূনরায় চালু করার ব্যাপারে মাওলানা নিজামীর দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো অত্যন্ত ইতিবাচক। তারই ঐকান্তিক ইচ্ছা ও প্রানান্তকর প্রয়াসে কর্ণফুলী পেপার মিলের বন্ধকৃত কস্টিক ক্লোরিন প্লান্ট, খুলনা হার্ডবোর্ড মিল এবং রংপুর সুগার মিল পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে। ফলে তখন এ ২টি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানই লাভজনক অবস্থায় পরিচালিত হয়। এই লাভ ধরে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন দীর্ঘ ১০ বছরের মধ্যে ২০০৫-০৬ আখ মাড়াই মৌসুমে মাওলানা নিজামী মন্ত্রী থাকাকালে প্রথম বারের মতো ৭০ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়। ঢাকা মহানগরীর পরিবেশ উন্নয়নের জন্য হাজারীবাগে অবস্থিত ট্যানারি শিল্পকে সাভারে নতুন স্থাপিত চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন চলছে। এছাড়া ফার্মাসিউটিকেল ইন্ডাস্ট্রি, প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি ও অটোমোবাইল ওয়ার্কশপের জন্য পৃথক শিল্পনগরী গড়ে তোলার কার্যক্রম হাতে হয়েছে। লবন আমাদের দৈনন্দিন ভোগ্যপন্যের একটি অপরিহার্য উপদান। দেশে মোট সাড়ে ১১ লাখ মে. টন লবনের চাহিদা থাকলেও বিগত ২০০৫-০৬ উৎপাদন মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে ১৫ লাখ ৭৫ হাজার মে. টন লবন উৎপাদিত হয়েছে যা এ যাবত কালের সর্বোচ্চ রেকর্ড। নি:সন্দেহে এ অর্জন মাওলানা নিজামীর সঠিক দিক নির্দেশনার ফসল। এ ছাড়াও বিগত ২০০৫-০৬ অর্থ বছরে শিল্প মন্ত্রনালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ক্যামিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন এবং বাংলাদেশ স্টিল এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন তাদের উৎপাদন লক্ষমাত্রা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। মাওলানা নিজামীর দায়িত্বাধীন শিল্পনালয়ের আরও কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো বিসিকের মাধ্যমে ১ লক্ষ ৩২ হাজার ৩৭৫ জন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, বি এস টি আই এর আধুনিকায়ন, ফুড ফর্টিফিকেশন এলায়েন্স গঠন, ন্যাশনাল এক্রিডিটেশন এবো গঠন ইত্যাদি জাতীয় মেধা সম্পদের অধিকার সংরক্ষন শিল্পের ব্যাপারে আমীরে জামায়াতের বক্তব্য ছিলো অত্যন্ত সুস্পষ্ট এভাবে মন্ত্রী হিসাবে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী প্রতিটি ক্ষেত্রেই সততা দক্ষতা ও আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে। মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পালন কালে তার দরদী মন ও সুন্দর আচরণ আজো স্মরণ করেন কর্মকর্তা কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট সকলে। মাওলানা নিজামীর নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নানামুখী ব্যস্ততার পরও মাওলানা নিজামী তার নিজ এলাকা সাথিয়া বেড়া থেকে এতটুকু বিমুখ হননি। সাথিয়া বেড়াবাসীর নন্দিত নেতা তিনি। এ এলাকার জনগণ তাকে তাদের এযাবতকালের শ্রেষ্ঠ নেতা হিসাবে গ্রহন করেছে। উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে পড়া সাথিয়া বেড়া তথা পাবনাবাসীর নিকট তিনি কর্মনিষ্ঠা, সততা আর দক্ষতার মূর্ত প্রতিক। এমন কি প্রাকৃতিক দূর্যোগকে উপেক্ষা করেও তিনি তার কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। মাওলানা নিজামী বিশ্বাস করেন যে যোগাযোগ ব্যবস্থা তথা রাস্তাঘাট ও ব্রীজ কালভার্টের উন্নয়ন যে কোন এলাকার উন্নয়নের পূর্বশর্ত। তাই তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরই সাথিয়া বেড়ার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে নজর দেন। জোট সরকারের আমলে তিনি ১৮৫ কি মি সড়ক পাকা করেছেন। পৌরসভার প্রায় প্রতিটি রাস্তাই সংস্কার ও উন্নয়নের ছোয়া পেয়েছে। আজ সাথিয়া বেড়া কোন অনুন্নত এলাকার নাম নয় একটি সম্ভবনার নাম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কাজ হলো শালগড় ঈদগাহ মাঠ হতে কালাইচড়া আব্দুল হামিদের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা, ভবানিপুর থেকে শালগড় ঈদগাহ মাঠ পর্যন্ত সড়ক, বেড়া ডাকবাংলো থেকে সাথিয়া হয়ে মাধবপুর বিশ্বরোড পর্যন্ত সড়ক, দেবিপুর তেবাডয়া বাজার থেকে স্বরগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সড়ক, মাধবপুর বিশ্বরোড় হতে দবিরশেখের বাড়ি হয়ে আবু বকর সিদ্দিকের বাড়ি সড়ক, নওয়ানী ফয়জের বাড়ী হতে ফজলুল হকের বাড়ি, হতে ঈদগাহ মাঠ সড়ক হতে নাটিয়া বাড়ী বিশ্বরোড পর্যন্ত রাস্তা মেরামত, আফড়া তমিন সরকারের বাড়ির ব্রীজ, হাজরাতলা বটগাছ মোড় হতে ভুলবাড়িয়া ইউপি অফিস সড়ক, নাড়িয়া গদাই থেকে জোড়গাছা সড়কে ইছামতি নদীর উপর ব্রীজ নির্মান, হলুদঘর থেকে গোপালপুর সড়কে ইছামতি নদীর উপর ব্রীজ নির্মান, সোনাতলা ইছামতি নদীর উপর ব্রীজ, ভুলবাড়িয়া হতে হাট বাড়িয়া সড়কে ইছামতি নদীর উপর ব্রীজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া আরো অনেক সড়ক তার প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে সংস্কার বা মেরামত করা হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি অবকাঠামোগত আরও অনেক উন্নয়ন মাওলানা নিজামীর হাত ধরেই হয়েছে। জাতির মেরুদন্ড শিক্ষা বিস্তারে মাওলানা নিজামীর রয়েছে অনন্য অবদান। বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে সাথিয়া বেড়া অঞ্চলের ১০টি মাদ্রাসার এমপিওভূক্তি বাতিল করা হয়। জোট সরকার ক্ষমতা নেয়ার পরপরই তা পূর্ণবহাল করা হয়। তার প্রত্যক্ষ আনুকূল্যে এখানকার বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের সোপান খুজে পেয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো: সাথিয়া ডিগ্রী কলেজ, আল হেরা একাডেমী, ইমাম হোসেন একাডেমী, নাকালিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাকালিয়া বাতেনিয়া দাখিল মাদ্রাসা, বেড়া আলিম মাদ্রাসা, হুইখালি বাংলা উচ্চবিদ্যালয়, সাথিয়া যশোমন্ত দুলিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিষ্মুবাড়িয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, খলিশাখালি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পীরহাটিসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলোকদিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরপাইরহাটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সিলন্দা উচ্চ বিদ্যালয়, পাথাইলহাট সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাগডেমরা ১নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাথিয়া ডিগ্রী কলেজ, বোয়াইলমারী কামিল মাদ্রাসা, সাথিয়া পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মনজুর কাদের মহিলা কলেজ, বেড়া আল হেরা একাডেমী, বেড়া ডিগ্রী কলেজ, বেড়া আলিম মাদ্রাসা, বেড়া বি বি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ইত্যাদি। আমাদের দেশের জনগোষ্ঠিকে জনসম্পদে পরিনত করতে হলে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই এ কথাটি তিনি যথাথই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন বা উন্নয়নই নয়, ছাত্র ছাত্রীদেরকে শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচিতেও মনোনিবেশ করেন। এর মধ্যে কৃতি ছাত্রদের সংবর্ধনা, পুরস্কার প্রদান, বৃত্তি প্রদান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি প্রদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মাওলানা নিজামীর প্রত্যক্ষ উদ্যোগ ও অর্থানুকূল্যে সাথিয়া বেড়া উপজেলায় বাস্তবায়িত আরো কিছু উন্নয়ন প্রকল্প হচ্ছে, মসজিদ মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মান, উন্নয়ন ও অর্থায়ন, বিদ্যুতায়ন, বৃক্ষরোপন, স্বস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মান ও উন্নয়ন। আমরা জানি, বাংলাদেশে বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি দুষ্ট ক্ষতের ন্যায় কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগও রয়ে গেছে। এর মধ্যে বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছাসই প্রধান। সাথিয়া বেড়া বা পাবনাও এ থেকে মুক্ত নয়। বেড়াকে যমুনা নদীর ভাঙ্গন থেকে রক্ষার জন্য তার আন্তরিক প্রয়াস সবার প্রশংসা অর্জন করেছে। বেড়া পানি উন্নয়ন বোডের অধীনে যমুনার পশ্চিম তীর সংরক্ষন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সে কাজে ব্যয় নিরুপন করা হয়েছে ২৫০,০০,০০০/= টাকা। ফলে কৃষকরা আগে যেখানে বছরে একটি মাত্র মৌসুমে ফসল পেত সেখানে এখন তিনটি ফসল ফলানো সম্ভব হবে। বিগত বন্যায় অসহায় মানুষ তাকে যেভাবে কাছে পেয়েছে তাতে তিনি তাদের চোখের মনিতে পরিনত হয়েছেন। জীবনের ঝুকি অগ্রাহ্য করে তিনি নিজে ঘুরে ঘুরে দেখছেন বন্যার্তদের অবস্থা। তাদের মাঝে বিতরণ করেছেন চাল ডালসহ খাদ্রদ্রব্য, পরিধেয় বস্ত্রাদি এমন কি জীবন রক্ষাকারী ঔষধও। বক্তৃতা বিবৃতির মাধ্যমে চেষ্টা করেছেন জনগণের মনে সাহস সঞ্চার করার। শুধু এখানেই নয়, দূর্যোগ পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্থরা যাতে আবার দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে তার জন্য নগদ অর্থ, ঢেউটিন বিতরণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন। কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার: রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সরকার জামায়াত নেতৃত্বকে সাজা দেয়ার আয়োজন সম্পন্ন করে। ১৯৭৩ সালের আইনে সংশোধন এনে দলীয় তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে মিথ্যা অভিযোগ ও সাজানো সাক্ষী দিয়ে কথিত মানবতাবিরোধী বিচারের রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই বিচারের জন্য প্রণীত আইন ও বিধিমালা নিয়ে শুরু থেকেই দেশে-বিদেশে বিশেষজ্ঞগণ গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন জে র‌্যাপ, আইনজীবীদের বিশ্বের সর্ববৃহৎ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল বার অ্যাসোসিয়েশন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইট্স ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব ও সংস্থা এ নিয়ে আইন সংশোধনের জন্য নানা সুপারিশও দিয়েছে। কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাতই করেনি। সরকার তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চিরতরে শেষ করে দেয়ার জন্য জাতীয় নেতৃবৃন্দকে একের পর এক হত্যা করেই চলছে। ইতোমধ্যে এক সাংবাদিক সম্মেলনে সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল স্বীকার করেছেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই বিচার হচ্ছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হত্যার জন্যই আইন: যুদ্ধাপরাধের জন্য প্রণীত আইনটি নিজেই ন্যায়বিচারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। এটি মূলত এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে যাতে রাষ্ট্রপক্ষ সবক্ষেত্রেই আইনি পন্থায় বেআইনি সুবিধা লাভ করতে পারে। ট্রাইব্যুনাল গঠন থেকে শুরু করে তদন্ত, বিচারক নিয়োগসহ সাক্ষ্যগ্রহণ এমনকি ফাঁসি কার্যকর করা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই এ বিশেষ সুবিধার প্রতিফলন ঘটেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ৬ নং ধারা অনুযায়ী সরকার চাইলে এক বা একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারবে। যেখানে সরকার নিজেই বাদি সেখানে ট্রাইব্যুনাল গঠন ও বিচারক নিয়োগের এখতিয়ার সরকারের হাতে থাকায় নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনাল গঠন বা ন্যায়বিচার কোনটি-ই সম্ভব না। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনাল চাইলে দ্রুত বিচারের স্বার্থে কোনো সাক্ষ্য ছাড়াই বিচারকার্য সম্পন্ন করতে পারবে আবার চাইলে রায় দেয়ার জন্য একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যই পর্যাপ্ত মনে করতে পারবে। শুধু তাই নয়, দেশীয় আদালতে বিচার হলেও সাক্ষ্য আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধির মত মৌলিক আইনগুলোকে বাতিল করে পত্রিকায় ছাপানো খবর বা প্রবন্ধ, সাময়িকী, সিনেমা, টেপ রেকর্ডারসহ সব ধরনের অনির্ভরযোগ্য প্রমাণপত্র গ্রহণের এখতিয়ার আদালতের রয়েছে, যা ন্যায়বিচারের পথকে বন্ধ করে দিয়েছে। যখন একজন বিচারকের স্কাইপ কেলেঙ্কারি জনসাধারণের নিকট প্রকাশ পায় তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় যে এটি মূলত বিচারের নামে প্রহসনের নাটক ছাড়া আর কিছুই নয়। ২১ নং ধারায় বলা হয়েছে যে, শুধু আসামিপক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। আইনটি এরকম ছিল কারণ তারা নিশ্চিত ছিল যে, আদালত অভিযুক্তদের ফাঁসি দেবে। কিন্তু পক্ষপাতদুষ্ট বিচারক নিয়োগ দেয়ার পরও যখন শহীদ আবদুল কাদের মোল্লাকে শুধু যাবৎজীবন কারাদন্ড দেয়া হয় তখন বিচারিক হত্যা নিশ্চিত করার জন্য ধারাটি সংশোধন করে রাষ্ট্রপক্ষকেও আপিল করার অধিকার দিয়ে সংশোধনীর ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা প্রদান করা হয়, যা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। তখন বুঝার আর বাকি থাকে না যে, এটি আসলেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আইনের মাধ্যমে একটি বিচারিক হত্যার আয়োজন ছাড়া আর কিছুই নয় এবং এর সর্বশেষ শিকার মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। এ দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ সকল ইসলামী নেতৃবৃন্দ তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। শাহাদাতের পূর্বে মাওলানা নিজামীর দীর্ঘ মোনাজাত: এরপর আব্বু আমাদের অনুরোধে আল্লাহর কাছে দু’হাত তুলে দোয়া করেন। প্রায় ঘন্টাখানেক এই মোনাজাতপর্ব স্থায়ী হয়। আল্লাহর প্রশংসা ও নবী করীম (সাঃ) এর প্রতি দুরুদ পাঠ করার পর প্রথমে প্রায় ২০ মিনিট, রাসূল (সা)-এর শিখিয়ে দেয়া মাসনুন দোয়াগুলো, যেগুলো আব্বুকে সারা জীবন করতে দেখেছি সেগুলো পাঠ করেন। অতঃপর তিনি বলেন, “হে আল্লাহ আমি তোমার এক নগণ্য গুনাহগার বান্দাহ, তুমি আমাকে যতটুকু তোমার দ্বীনের খেদমত করার তাওফিক দিয়েছো তা মেহেরবানি করে কবুল করে নাও। আমাকে ইসলাম ও ঈমানের ওপর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টিকে থাকার তাওফিক দাও আর শাহাদাতের মৃত্যু দান কর। হে আল্লাহ তুমি আমাকে আর আমার বংশধরদেরকে নামায কায়েমকারী বানাও আর আমাকে আমার পিতা-মাতাকে আর সকল মুমিনদেরকে কাল কিয়ামতের দিনে ক্ষমা কর। হে আল্লাহ আমাদেরকে পরিপূর্ণ ঈমান দান কর, তোমার ওপর সত্যিকারের ভরসা করার তাওফিক দান কর। আমাদের জিহবাকে তোমার সার্বক্ষণিক জিকিরকারী বানাও। আমরা তোমার কাছে, তোমার ভয়ে ভীত অন্তর, উপকারী জ্ঞান, হালাল প্রশস্ত রিজিক, সুস্থ বুদ্ধি ও দ্বীনের সঠিক বুঝ ভিক্ষা চাচ্ছি। হে আল্লাহ আমাদেরকে মৃত্যুর পূর্বে তওবা করার তাওফিক দাও, মৃত্যুর সময় আরাম দান কর, মৃত্যুর পরে তোমার ক্ষমা লাভ করার তাওফিক দাও ও দোজখের আগুন থেকে রক্ষা কর। হে আল্লাহ তোমার হালালকৃত জিনিসের মাধ্যমে হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দাও, তোমার আনুগত্যের মাধ্যমে তোমার নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দাও আর আমাদেরকে তুমি ছাড়া কারও মুখাপেক্ষী করো না। আল্লাহ তোমার নুর দিয়ে আমাদেরকে হেদায়াত দান কর। আমাদের সকল গুনাহ খাতা তোমার সামনে পরিষ্কার, তোমার কাছেই ক্ষমা চাচ্ছি ও তোমার নিকট প্রত্যাবর্তন করছি। ইয়া হান্নান ইয়া মান্নান।” তিনি আরো দোয়া করেন, “হে আল্লাহ তুমি এই দেশকে তোমার দ্বীনের জন্য কবুল করে নাও, এই দেশের জন্য শান্তির ফয়সালা করে দাও। এ দেশকে গুম, খুন, রাহাজানি ও আধিপত্যবাদীদের হাত থেকে রক্ষা কর”। তিনি দেশ ও দেশবাসীর সুখ সমৃদ্ধির জন্যও দোয়া করেন। এই আবেগঘন মোনাজাতের সময় আমার মেয়ে কয়েকজন জেল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর চোখে পানি দেখেছে বলে পরে আমাকে জানায়। অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় প্রিয় নেতার বিদায়: রায় কার্যকরের নির্বাহী আদেশ ১০ মে সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কারাগারে পাঠানো হয়। রাত ১২টা ১০ মিনিটে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী মহান রবের পানে চলে যান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। রাত ১টা ৩০ মিনিটে কারা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে শহীদ নিজামীর লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে রওনা করে তার গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে। সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে লাশবাহী বহর পৌঁছে সাঁথিয়ার মনমথপুরে জন্মভূমিতে। সেখানে পূর্ব থেকেই উপস্থিত ছিলেন তার পরিবারের সদস্যগণ ও হাজারো শোকাহত জনতা। শহীদ নিজামীর কফিনবাহী গাড়ির বহর বাড়িতে পৌঁছলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সাধারণ মানুষ তাদের নেতাকে এক নজর দেখার জন্য আকুতি করতে থাকে এবং ঢুকরে কেঁদে ওঠে। কিন্তু মানুষের এই কান্না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হৃদয় গলাতে পারেনি, ফলে শেষবারের মত তাদের প্রিয় নেতার মুখ দেখতে পারেনি সাধারণ জনতা। তাদের সমস্বরের কান্নায় মনমথপুরের আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। উপস্থিত জন¯্রােত সামলাতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকেও হিমশিম খেতে হয়। তারপর কফিনবাহী অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যাওয়া হয় বাড়িসংলগ্ন মনমথপুর কবরস্থানে। সেখানে পূর্ব থেকেই অপেক্ষমাণ হাজার হাজার মানুষ সারিবদ্ধ হয়ে জানাযায় দাঁড়িয়ে যায়। সকাল ৭টায় অনুষ্ঠিত জানাযায় হাজার হাজার মানুষ শরিক হন। জানাযা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আইনশৃংখলা বাহিনীর লোকেরা লাশ নিয়ে যায় কবরস্থানে। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো সাধারণ মানুষ কবরস্থানে ঢুকে পড়তে চাইলে আইনশৃংখলা বাহিনী তাদের বাধা দেয়। তাদের বাধা উপেক্ষা করে হাজার-হাজার মানুষ কবরস্থানে প্রবেশ করে। শতবাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে দাফনের পর একই স্থানে ২৬ বার গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়, যা ইতিহাসে বিরল। দেশে-বিদেশে জানাযা: মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর গায়েবানা জানাযা দেশে বিদেশে বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। এসব জানাযায় লাখ লাখ জনতা অংশগ্রহণ করে। কেন্দ্রীয়ভাবে ১১ মে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে একাধিক গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত তৌহিদী জনতা মাওলানা নিজামীর জন্য চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে তাঁর শাহাদাতের মর্যাদা কামনা করেন। গায়েবানা জানাযা শেষ হওয়ার পর মুসল্লিরা শ্লোগান দিতে দিতে ও ভি চিহ্ন দেখিয়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে যান। চট্টগ্রামের প্যারেড ময়দান ও তার সংলগ্ন সড়ক, সিলেটের সরকারি আলিয়া মাদরাসা ময়দান, রাজশাহীর হেতেম খা গোরস্থানসহ দেশের প্রতিটি জেলা ও বিভিন্ন উপজেলা, জনপদে গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বাইরে মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী, জেদ্দা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক, মিশিগান, ব্রুকলেন, লন্ডনের আলতাব আলী পার্ক, তুরস্কের আঙ্কারা, ইস্তাম্বুল, ওমান, বাহরাইন, কাতার, মালয়েশিয়া, কুয়েত, জাপান, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, কানাডার মন্টিয়াল, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান, কাশ্মিরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মাগফেরাত কামনায় অসংখ্য গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।

শহীদ আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ

শহীদ প্রোফাইল

আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ

শহীদ মাওলানা এ কে এম ইউসুফ ছিলেন একাধারে স্বনামধন্য মুহাদ্দিস, প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও মুহাক্কিক। তিনি একজন দক্ষ সংগঠকও ছিলেন। তিনি তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে গেছেন এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীরের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন এদেশের ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি চাষী কল্যাণ সমিতির মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরের মানুষের খেদমত করে গেছেন। তার এই সমাজসেবামূলক কর্মের মাধ্যমে অমুসলিমরাও উপকৃত হয়েছেন। তিনি বলেন, জুলুমবাজ সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থের জন্য কথিত বিচারের নামে প্রহসন করে তাকে কারারুদ্ধ করে তিলে তিলি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। জন্ম: ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাগেরহাটের শরণখোলায় মা-বাবার ঘর আলো করে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহান ব্যক্তিত্ব। আবার পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন ৮৭ বছর বয়সে আরেক ফেব্রুয়ারি মাসে। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে বেলা এগারোটা তিরিশ মিনিটে রাজধানীর পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায়। শিক্ষা ও ক্যারিয়ার: মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলা শরণখোলার বাসিন্দা। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা তার গ্রামের স্কুল এবং পরে রায়েন্দার একটি স্কুল থেকে সম্পন্ন করেন। তিনি শর্ষিনা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে মাধ্যমিক স্তরের পড়ালেখা শেষ করেন। শহীদ এ কে এম ইউসুফ ফাজিল এবং কামিল পড়াশোনা করেন ঢাকা আলিয়া থেকে। ১৯৫০ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে ফাজিল (সম্মান) পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে দেশে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপরেই তিনি ১৯৫২ সালে স্নাতক (কামিল) পরীক্ষা শেষ করেন, মমতাজ আল-মুহাদ্দেসিন হিসাবে স্বীকৃতি অর্জন করেন, দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামের পন্ডিতদের কাছে এটি সর্বোচ্চ সুনাম। তিনি ১৯৫২ সালে মাদ্রাসা শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৯৫৮ সালে খুলনা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হন। তিনি মথবাড়িয়ার (বরিশাল) একটি সিনিয়র মাদ্রাসায়ও শিক্ষকতা করেছিলেন, যেখানে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি শুধু বাংলাদেশেরই নয় বরং উপমহাদেশের অন্যতম হাদীস বিশারদ। হাদীসের মশহুর কিতাব “হাদীসের আলোকে মানব জীবন” তাঁর অনন্য কীর্তি। বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ অথচ জীবনঘনিষ্ঠ হাদীসসমূহ এবং সেই সাথে সংক্ষিপ্ত প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা সন্নিবেশিত করে তিনি যে অনন্য সাধারণ হাদীস গ্রন্থ সংকলন করেছেন- এই একটি মাত্র কারণেই তিনি আমাদেরকে ঋণী করে গিয়েছেন অনাগত কালের জন্য। পারিবারিক জীবন: মাওলানা এ কে এম ইউসুফ ১৯৪৯ সালে রাবেয়া খাতুনকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে আছে ৩ ছেলে ৫ মেয়ে। সন্তানরা সবাই উচ্চশিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত। ইসলামী আন্দোলনে যোগদান: শহীদ আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ ১৯৫২ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। তাঁর জামায়াতে যোগদানের মূল কারণ ছিলো আরেক মুমতাজুল মুহাদ্দেসীন মাওলানা আব্দুর রহীম। তাছাড়া তিনি মাওলানা মওদূদীর লেখার ভক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৫৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি জামায়াতের খুলনা বিভাগের আমীর ছিলেন। ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে আইয়ুব খানের দ্বারা পাকিস্তানে সামরিক আইন ঘোষণার পরে সমস্ত দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সামরিক আইন প্রত্যাহারের পরে শহীদ ইউসুফ জামায়াতের পূর্ব পাকিস্তানের নায়েব-ই-আমীর (সহসভাপতি) পদে নিযুক্ত হন। একাত্তরের পরে, একেএম ইউসুফ জামায়াতের সিনিয়র নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সক্ষমতা নিয়ে কাজ করেছিলেন। আমীর মাওলানা আবদুর রহিমের অধীনে তিনি এক মেয়াদে সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। তিনি আবারও একই দায়িত্বে জামায়াত আমীর গোলাম আযমের সাথে টানা তিনবার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর সাথে তিনি বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েব-আমির হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই দায়িত্বে অব্যাহত ছিলেন। রাজনৈতিক জীবন: ১৯৬২ সালের নির্বাচনে মাওলানা এ কে এম ইউসুফ নির্বাচনী এলাকা খুলনা ও বরিশালের প্রার্থী হওয়ার জন্য জামায়াত থেকে মনোনীত হয়েছিলেন। আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা থেকে ছুটি নিয়ে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয়ী হন। ৩৫ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সর্বকনিষ্ঠ প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি ১৯৬০-এর দশকে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে নাগরিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন এবং ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৭১ সালে তিনি মালেক মন্ত্রীসভার একজন মন্ত্রী ছিলেন। অন্যান্য সামাজিক কাজ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্ব পালন ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শহীদ এ কে এম ইউসুফ শরীয়াহ কাউন্সিল, দারুল আরাবিয়া, কেন্দ্রীয় ওলামা-মাশায়েখ কমিটি প্রভৃতি সংস্থা, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য সামাজিক কাজ হলো চাষী কল্যাণ সমিতি। তিনি ছিলেন এদেশের লক্ষ লক্ষ চাষিদের নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ চাষি কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি। এদেশের গ্রামীণ জনপদের চাষিদের সংগঠিত করা, তাদের মাঝে আদর্শিক চেতনা জাগ্রত করা, তাদের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের বাস্তবমুখী উদ্যোগ নেয়া এইসব লক্ষ্য নিয়ে তিনি চাষী কল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি পাকিস্তান আমল থেকে বাগেরহাট ও খুলনায় অসংখ্য ইয়াতিমখানা, স্কুল, মাদরাসা ও মসজিদ স্থাপন করেন। অসিয়ত ২০১৩ সালের ৪ মে তিনি তাঁর সন্তান, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্দেশ্যে অসিয়ত করে গিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আমার বয়স এখন ৮৭ বছরে উপনীত হয়েছে। আমার সমবয়সী সাথী ও বন্ধুদের অধিকাংশই এখন দুনিয়া ত্যাগ করে পরপারের যাত্রী। যেহেতু আমার বয়স অধিক; উপরন্তু আমি নানা রকম জটিল রোগে আক্রান্ত যে কোন সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে পরপারের আহ্বান আসতে পারে। আমি পরম করুণাময় আল্লাহর একজন ক্ষুদ্র বান্দা ও দাস। মহান রাব্বুল আলামীন আমার নিজের ও সন্তান-সন্ততি ও নাতী-নাতনীদের ওপরে করুণার যে ধারা প্রবাহিত রেখেছেন, আমার কামনার চেয়ে তা অনেক অধিক, যার শুকরিয়া আদায় করা আমার সাধ্যের অতীত। আমি আমার সন্তান ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই যে, দেশ ও দেশের বাইরে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য যারা কাজ করেছেন, আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা নিয়ে আমি তাদের কাতারে শামিল ছিলাম। পরম করুণাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার উপরে অনুগ্রহ ছিল, ফলে আমি দেশ-বিদেশের কতিপয় নেক বান্দাহ ও দাতা সংস্থার সাহায্যে আমার মাতৃভূমির সব এলাকায় বেশ কিছু সদকায়ে জারিয়াহর কাজ করেছি। আমি আমার সন্তান ও শুভাকাংখীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই যে, তোমরা তোমাদের পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজনদের অধিকারের ব্যাপারে যেমন সতর্ক থাকবে। তেমনি সতর্ক থাকবে প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের অধিকারের ব্যাপারেও। মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের কথাটাও যেনো তোমাদের চিন্তায় থাকে। সাধ্যের মধ্যে থেকে তোমরাও সবসময় সদকায়ে জারিয়াহর কাজ করবে। কেননা সদকায়ে জারিয়াহর সওয়াব মৃত্যুর পরেও আমলনামায় জমা হতে থাকে। তোমরা আল্লাহ তা’আলার নির্দেশিত ফরজ ইবাদতসমূহ যেমন নামাজ, রোজা, জকাত ও হজ্জ আদায়ের ব্যাপারে আদৌ গাফলতি করবেনা। গুনাহের কাজের ধারে কাছেও যাবে না। আর নিয়তই নৈতিক চরিত্রের উঁচুমানে পৌছার জন্য সচেষ্ট থাকবে। ওপরে যে অসিয়ত আমি আমার সন্তান-সন্ততিদের উদ্দেশ্যে করলাম, ঐ একই অছিয়ত আমার আন্দোলনের সাথী প্রবীণ ও তরুণদের জন্যও রইল।” সাহিত্য: মাওলানা এ কে এম ইউসুফ একজন সুপরিচিত আলেম এবং কোরআন অধ্যয়ন ও হাদিস সম্পর্কিত শিরোনাম সহ বেশ কয়েকটি বহুল পঠিত বই লিখেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মহাগ্রন্থ আল কুরআন কি এবং কেন?, হাদীসের আলোকে মানব জীবন, দর্পন, দেশ হতে দেশান্তরে, কুরআন হাদীসের আলোকে জিহাদ, জামায়াতে ইসলামী বিরোধীতার অন্তরালে। শাহদাত: ইসলামী আন্দোলনকে স্তব্দ করে দিতে মরিয়া পাশের দেশের মুশরিকরা ও তাদের পদলেহনকারী স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার। এরই অংশ হিসেবে ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের গ্রেপ্তার ও মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়। কাল্পনিক সব অভিযোগ আনে দেশের সবচেয়ে উত্তম মানুষগুলোর প্রতি। এর মধ্যে পাঁচজন নেতাকে ফাঁসী দিয়ে হত্যা করে। শহীদ এ কে এম ইউসুফ ছিলে অত্যন্ত বৃদ্ধ ও অনেক রোগের রোগী। তাঁকে বিনা চিকিৎসায় কারাগারে আটকে রাখা হয়। তিনি স্ট্রোক করার পরও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। চিকিৎসা না দিয়ে তাঁকে খুন করে সন্ত্রাসীরা। মুমতাজ আল মুহাদ্দিসীন নিজের জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত ইসলামের উপর টিকে ছিলেন। কোনো আপোষ করেননি সরকারের সাথে। ২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে তিনি শাহদাতের নজরানা পেশ করেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁকে শাহদাতের মর্যাদা দান করুন।

শহীদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী

শহীদ প্রোফাইল

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আল্লামা সাঈদী রহ. বিশ্বখ্যাত একজন ইসলামিক স্কলার ও রাজনীতিবিদ। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন ছিলেন। জালিমদের শত অত্যাচারে তিনি ছিলেন অবিচল। জীবনের শেষ ১৩ টি বছর তিনি বহুকষ্টে কারাগারে কাটিয়েছেন। তবুও জালিমদের কোনো ফাঁদে পা দেননি। জালিমের বশ্যতা স্বীকার করেননি। তিনি একাধারে আলেম, ইসলাম প্রচারক, লেখক, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী ও সংসদ সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশের শীর্ষ জনপ্রিয় নেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাঁর জনপ্রিয়তা ধর্ম, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্র সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। হাসিনা সরকার তাঁকে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। জন্ম ও শিক্ষা শহীদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৪০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানীর বালিপাড়া ইউনিয়নের সাঈদখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম ইউসুফ সাঈদী একজন আলেম, শিক্ষক ও ধর্ম প্রচারক ছিলেন। শহীদ আল্লামা সাঈদী ছারছিনা আলিয়া মাদরাসা ও খুলনা আলিয়া মাদরাসায় তিনি পড়াশোনা করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি তাফসির শাস্ত্রে কামিল পাশ করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি ইসলাম প্রচারের সাথে যুক্ত হন। আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শেষ করার পর তিনি দীর্ঘ ৫ বছর ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, মনোবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন মতাদর্শ ও ভাষার ওপর বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা কার্যে নিজেকে নিয়োজিত করেন। পারিবারিক জীবন আল্লামা সাঈদী রহ. ১৯৬০ সালে বেগম সালেহা সাঈদীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির ৪ সন্তান। রাফীক বিন সাঈদী, শামীম বিন সাঈদী, মাসুদ বিন সাঈদী ও নাসিম বিন সাঈদী। এর মধ্যে ১ম সন্তান রাফীক বিন সাঈদী ২০১২ সালের ১৩ জুন ইন্তেকাল করেন। সাংগঠনিক জীবন সত্তরের দশক থেকে শহীদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ইসলামী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। ১৯৭৯ সালে তিনি জামায়াতের রুকন শপথ নেন। ১৯৮৯ সালে তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য হন। আল্লামা সাঈদী ১৯৯৬ সালে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য হন। ১৯৯৮ সালে তিনি কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য হন। আল্লামা সাঈদী রহ. ২০০৯ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর হন। সেই থেকে শাহাদাত পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনৈতিক জীবন শহীদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রহ. ইসলামকে পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ করার চেষ্টা করতেন। জামায়াতে ইসলামীর বেসিক শিক্ষাই এটা। ফলশ্রুতিতে তিনি এদেশের রাজনৈতিক কর্মকান্ডও যাতে ইসলামের বিধান অনুসারে হয় সেজন্য চেষ্টা সাধনা করেছেন। তিনি পিরোজপুর-১ আসন থেকে জামায়াতের মনোনয়ন নিয়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর এলাকা হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ার পরও তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদে স্পিকারের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে ঢোকার যে শিরকি রীতি ছিল, আল্লামা সাঈদীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তা বন্ধ হয়েছিল। আল্লামা সাঈদী জামায়াতের পার্লামেন্টারি পার্টির ডেপুটি লিডার ছিলেন। তিনি ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সদস্য ছিলেন। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় পানি সম্পদ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় কৃষি পুরস্কারের ট্রাস্টি বোর্ড মেম্বার ছিলেন। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের যাকাত বোর্ডের সদস্য ছিলেন। এছাড়াও তিনি বহু রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সনের ২০ ডিসেম্বর জাতীয় স্টেডিয়ামে সাফ গেমস উপলক্ষে নির্মাণ করা হয়েছিলো চব্বিশ ঘন্টা প্রজ্জলিত থাকার জন্য ‘মশাল টাওয়ার’। মশাল টাওয়ার তথা আগুন পূজার বিরুদ্ধে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী তাওহিদী জনতাকে সাথে নিয়ে দেশে প্রবল গণ-আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন এবং মশাল টাওয়ার ভেঙ্গে ফেলার জন্য সরকারকে এক সপ্তাহের আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। তদানীন্তন সরকার আল্লামা সাঈদীর সে আন্দোলনে ভীত হয়ে এক সপ্তাহের মধ্যেই মশাল টাওয়ার ভেঙে ফেলতে বাধ্য হয়েছিল। দ্বিতীয় দফা এমপি থাকাকালীন সময়ে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ৮ম জাতীয় সংসদের শেষের দিকে ২০০৬ সালের ২৯ আগষ্ট তারিখে জাতীয় সংসদে ‘কওমী সনদের স্বীকৃতি’ এবং কওমী মাদরাসার সমন্বয়, উন্নয়ন ও পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণের জন্য ‘কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ’ নামে একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গঠনের বিষয়ে জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করেছিলেন। জাতীয় সংসদে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী উত্থাপিত এই বিলের পরিপ্রেক্ষিতেই মূলতঃ পরবর্তীতে দাওরায়ে হাদীসকে ইসলামিক ষ্টাডিজ এবং এ্যারাবিক লিটারেচারে গ্রাজুয়েশান সমমান এবং এই ডিগ্রীধারীদের সরকারী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ কওে দেয়া সংক্রান্ত একটি নোটিফিকেশন জারি করেছিল তৎকালীন সরকার। যেটা পরবর্তীতে ইয়াজউদ্দিন আহমেদের কেয়ারটেকার সরকারের সময়ে ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর, বুধবার, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রজ্ঞাপন নং: শিম/শা:১৬/বিবিধ-১১(৯)/২০০৩(অংশ)/১০৩১। ১৯৮৯-৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এক বজ্রকণ্ঠ ছিলেন আল্লামা সাঈদী রহ.। ১৯৯৪ সালে কেয়ারটেকার আন্দোলন, ১৯৯৮ সালের পার্বত্য কালো চুক্তির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। জালিমের জুলুমের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় লড়ে গিয়েছেন। দাওয়াতী কাজ ১৯৬৭ সাল থেকে তিনি “দা’ঈ ইলাল্লাহ” হিসেবে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী পৃথিবীর অর্ধশতেরও বেশি দেশে আমন্ত্রিত হয়ে ইসলামের সু-মহান আদর্শ মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন। মুসলিমদের তিনি কুরআনের অনুশাসন মানার জন্য আহবান করেছেন। অমুসলিমদের তিনি ইসলাম গ্রহণের আহ্বান করেছেন। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে তিনি জালিমের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার আহ্বান করেছেন। তাঁর দাওয়াতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সহস্রাধিক অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয়েছেন। ক. চট্টগ্রাম প্যারেড গ্রাউন্ড ময়দানে প্রতি বছর ৫ দিন করে দীর্ঘ ২৯ বছর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। পবিত্র কাবা শরীফের সম্মানিত ইমাম এ মাহফিলে দু’বার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। খ. খুলনা সার্কিট হাউজ ময়দানসহ শহরের বিভিন্ন মাঠে প্রতি বছর ২ দিন করে দীর্ঘ ৩৮ বছর তাফসীর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। গ. সিলেট সরকারী আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে প্রতি বছর ৩ দিন করে দীর্ঘ ৩৩ বছর যাবৎ তাফসীর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ঘ. রাজশাহী সরকারী মাদ্রাসা মাঠে প্রতি বছর ৩ দিন করে দীর্ঘ ৩৫ বছর যাবৎ তাফসীর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ঙ. বগুড়া শহরে প্রতি বছর ২দিন করে দীর্ঘ ২৫ বছর যাবৎ তাফসীর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। চ. ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে ময়দান ও পল্টন ময়দানে প্রতি বছর ৩ দিন করে দীর্ঘ ৩৪ বছর যাবৎ তাফসীর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ছ. কুমিল্লা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে তিনদিন ব্যাপী প্রায় দীর্ঘ ৩১ বছর যাবৎ তাফসীর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও বাংলাদেশের প্রায় সবক’টি জেলায় তিনি তাফসিরুল কুরআন মাহফিল করার মাধ্যমে ইসলাম প্রচারে দীর্ঘ অর্ধশত বছর কাজ করেন। আল্লামা সাঈদীকে হত্যা চেষ্টা অন্তত: চার বার হত্যা করার লক্ষ্যে কোরআনের পাখি আল্লামা সাঈদীর প্রতি সরাসরি গুলী ছুড়া হয়েছিল এবং আক্রমন করা হয়েছিল। ১. প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯৭৩ সালের ১৪ জানুয়ারী। উত্তরবঙ্গের চাঁপাই নবাবগঞ্জের একটি কলেজ মাঠে আয়োজিত তাফসীর মাহফিলে অংশগ্রহনের জন্য কোরআনের পাখি আল্লামা সাঈদী চাঁপাই নবাবগঞ্জ গমন করেন। মাহফিল শেষে তাকে যে বাড়িতে রাখা হয়েছিলো সেখানে চরমপন্থী সন্ত্রাসীরা গুলি ছুঁড়ে আক্রমন করে। ২. হত্যা প্রচেষ্টার দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে ১৯৭৪ সালের ২৯ নভেম্বর। পাবনা শহরের অদূরে পুষ্পপাড়া আলিয়া মাদরাসা মাঠে আয়োজিত তাফসীর মাহফিলের প্রধান মেহমান ছিলেন আল্লামা সাঈদী। মাহফিল শেষে মাদারাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আইয়ুব আনসা শেষ হলে আল্লামা সাঈদীর বিশ্রামের জন্য নির্ধারিত জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন ঐ মাদরাসারই প্রধান মুহাদ্দিস মাওলানা নুরুল্লাহ। খাবার শেষ হতে না হতেই হঠাৎ ঘাতকেরা গুলি চালায়। ঘাতকের ছুঁড়ে দেয়া একঝাঁক বুলেট মুহুর্তেই ঝাঝড়া কওে দেয় আল্লামা সাঈদীর পাশেই দন্ডায়মান মাওলানা নুরুল্লাহর শরীর। ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করেন মাওলানা নুরুল্লাহ। এভাবে সে যাত্রায়ও আল্লাহ তায়ালা একান্ত দয়া পরবশে আল্লামা সাঈদীকে ঘাতকদের হাত থেকে প্রাণে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। ৩. তৃতীয় ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৮৬ সালের ২১ অক্টোবর। হত্যাপ্রচেষ্টার ঘটনাটি ছিল চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়। স্থানীয় বামপন্থী আর সমাজতন্ত্রীরা সন্ধার কিছু আগে স্থানীয় সাতকানিয়া স্কুল মাঠে আয়োজিত তাফসীর মাহফিলে অংশগ্রহনের পথে আল্লামা সাঈদীর গাড়ি আটকিয়ে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ আসার সাথে সাথেই সন্ত্রাসীরা যে যেদিকে পারে পালাতে থাকে। অস্ত্রসহ পুলিশ সেদিন ৫জনকে গ্রেফতারও করেছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে থানা পুলিশ সন্ত্রাসীদেরকে আর আটকে রাখতে পারেনি, ‘উপরের নির্দেশে’ তাদেরকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলো পুলিশ। আল্লাহ তায়ালা সেদিনও আল্লামা সাঈদীকে বাতিল শক্তির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন তাঁরই একান্ত দয়ায়। ৪. হত্যা প্রচেষ্টার চতুর্থ ঘটনাটি ঘটে ১৯৯২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। সেদিন ছিল রাজধানী ঢাকার পান্থপথে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত সীরাতুন্নবী (সা) মাহফিল। মাহফিলে প্রধান মেহমান ছিলেন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। মাগরিবের নামাজের পর লক্ষ লক্ষ জনতাকে নিয়ে কোরআনের পাখি আল্লামা সাঈদী যেইমাত্র তার আলোচনা শুরু করেছেন, ঠিক তখনি ঘাতকেরা আল্লামা সাঈদীকে উদ্দেশ্য করে পরপর ৮/১০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। আল্লামা সাঈদী শাহাদাতের তামান্না নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। মঞ্চে উপবিষ্ট শিবির সভাপতি আবু জাফর মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহসহ সকলেই আল্লামা সাঈদীকে বসিয়ে দেওয়ার জন্য হাত ধরে টানতে থাকে, ব্যাকুল কন্ঠে অনুরোধ করতে থাকে। কিন্তু আল্লামা সাঈদী দৃঢ় কন্ঠে সেদিন বলেছিলেন, “মৃত্যুকে সাঈদী ভয় পায় না। আমি আমার জীবন মহান আল্লাহর রাস্তায় ওয়াক্ফ করে দিয়েছি। লাখো জনতার মধ্যে যদি আমি বসে যাই, তবে দাঁড়িয়ে থাকবে কে?” উপস্থিত লাখো জনতা জীবনের মায়া ত্যাগ করে তাৎক্ষনিক আনোয়ারা হাসপাতাল ঘেরাও করে অস্ত্রসহ ৩জন গুপ্তঘাতককে ধওে ফেলেছিলো। বাকিরা পালিয়ে গিয়েছিলো। জনতা ঘাতকদেরকে পুলিশের হাতে সোপর্দও করেছিলো- কিন্তু তৎকালীন সরকার সন্ত্রাসীদের বিচার তো দূরের কথা, থানায় মামলাও গ্রহন করেনি। সামাজিক কাজ আল্লামা সাঈদী রহ. সামাজিক কাজ করে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে তাঁর এলাকার সকল মানুষকে আপন করে নিতে পেরেছেন। তাঁর দরজা থেকে কেউ খালি হাতে ফেরত যায়নি। তিনি সাধ্যমত সবসময় পাশে দাঁড়িয়েছেন। এছাড়াও তিনি দেশী বিদেশী বহু সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। যার মাধ্যমে সেবা পেয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। উপদেষ্টা – রাবেতা আলম আল ইসলামী, মক্কা আল মুকাররমা, সৌদি আরব উপদেষ্টা – বাংলাদেশ সৌদি আরব মৈত্রী সমিতি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য – শরীয়াহ কাউন্সিল, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ চেয়ারম্যান – এক্সিকিউটিভ কমিটি, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা সদস্য – ট্রাষ্টি বোর্ড, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম সভাপতি – বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক পরিষদ প্রতিষ্ঠাতা – দারুল কুরআন সিদ্দিকীয়া কামিল মাদরাসা, খুলনা চেয়ারম্যান – জামেয়া ই কাসেমিয়া, নরসিংদী চেয়ারম্যান – তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা, টংগী আজীবন সদস্য – ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ আজীবন সদস্য – বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি চেয়ারম্যান – তা’লিমুল কুরআন ফাউন্ডেশন চেয়ারম্যান – জামেয়া দ্বীনিয়া, টংগী, ঢাকা প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান – ইসলামিক কলেজ লন্ডন, ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠাতা – নিউইয়র্ক ইসলামিক স্কুল, আমেরিকা প্রতিষ্ঠাতা – আইটি এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ, পিরোজপুর প্রতিষ্ঠাতা – তাফহীমুল কুরআন দাখিল মাদরাসা, পিরোজপুর প্রতিষ্ঠাতা – তাফহীমুল কুরআন কিন্ডার গার্টেন স্কুল, পিরোজপুর প্রতিষ্ঠাতা – দারুল কুরআন মহিলা দাখিল মাদরাসা, পিরোজপুর প্রতিষ্ঠাতা – এসডি মদিনাতুল উলুম দাখিল মাদরাসা, পিরোজপুর চেয়ারম্যান – দারুল হানান শিশু সদন, পিরোজপুর উপদেষ্টা – বাংলাদেশ মসজিদ মিশন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি – ইত্তেহাদুল উম্মাহ পৃষ্টপোষক – আদর্শ স্কুল নারায়ণগঞ্জ পৃষ্টপোষক – পিরোজপুর জনকল্যাণ ট্রাষ্ট পৃষ্টপোষক – ইউকে ইসলামিক মিশন, ইংল্যান্ড প্রধান পৃষ্টপোষক – হিফজুল কুরআন এন্ড ইসলামিক সেন্টার লন্ডন, ইংল্যান্ড চেয়ারম্যান – তাফহীমুল কুরআন মাদরাসা, টাংগাইল গ্রেপ্তার ও প্রহসনের রায় কথিত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে মাজার পুজারীদের করা মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী গ্রেপ্তার হন। ওই বছরের ২১ জুলাই সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়। ২ নভেম্বর তাঁকে কথিত ও সাজানো মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষ আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। ৩ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগ গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু করে। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আল্লামা সাঈদীকে সাজানো মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর মৃত্যুদণ্ডকে কেন্দ্র করে সারাদেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের এমন কোনো উপজেলা বাকী ছিল না যেখানে এই রায়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভ প্রদর্শন হয়নি। তাঁর ভালোবাসায় লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। যুবক, বৃদ্ধ, শিশু কিশোর এমনি নারীরা পর্যন্ত এই প্রহসনের রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, অনেক এলাকার হিন্দু সম্প্রদায় পর্যন্ত আল্লামা সাঈদীর এই রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় প্রায় দুই সপ্তাহ দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। শেখ হাসিনা সরকার জনগণের বুকে গুলি চালিয়ে আল্লামা সাঈদীর প্রতি মানুষের ভালোবাসার জবাব দিয়েছিল। সারাদেশে আড়াই শতাধিক মানুষকে খুন করেছিল হাসিনা সরকার। পুলিশের নির্বিচার গুলিতেও মানুষ অবিচল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। একজন মানুষের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় এতো মানুষের জীবন দেওয়ার ঘটনা শুধু বাংলা নয় সারা পৃথিবীতে বিরল। এই অপার্থিব অর্জন কেবল আল্লামা সাঈদী রহ.-এর পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ২৮ মার্চ পৃথক দুটি আপিল হয়। একটি করেন আল্লামা সাঈদীর পক্ষ, আরেকটি করে সরকারপক্ষ। ট্রাইব্যুনালের রায়ে সাজা ঘোষিত না হওয়া ছয় অভিযোগে শাস্তির আর্জি জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ এবং ফাঁসির আদেশ থেকে আল্লামা সাঈদীর খালাস চেয়ে আপিল করে আল্লামা সাঈদীর আইনজীবীরা। আপিল শুনানি শেষে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয় সে সময়কার প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। বিচারপতিদের মধ্যে মো. আবদুল ওয়াহ্‌হাব মিঞা সব অভিযোগ থেকে আল্লামা সাঈদীকে খালাস দেন। আর বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী আসামির মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে রায় দেন। তবে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর মতামতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় আসে। শামসুদ্দিন মানিক তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি প্রতিবেশি রাষ্ট্রের পারপাস সার্ভ করেন বলে দেশবাসি মনে করে। অন্যদিকে বিচারপতি সিনহা বিভিন্ন সাক্ষাতকারে স্বীকার করেছেন তারা সরকারের চাপে এই প্রহসনের রায় দিয়েছেন। পেশাগত জীবন পেশাগত জীবনে আল্লামা সাঈদী ছিলেন শিক্ষক ও লেখক। তাঁর লেখা বই রয়েছে ৭৭ টি। শাহাদাত ২০২৩ সালের ১৩ আগস্ট রবিবার সকালে বুকের ব্যথায় অসুস্থ হয়ে পড়েন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রহ.। তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে করে কাশিমপুর কারাগার থেকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে সেখান থেকে পিজি হাসপাতালে পাঠানো হয়। কারা কর্তৃপক্ষের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে গাজীপুর থেকে ঢাকায় আসতে সারাদিন ব্যয় হয়ে যায়। ১৩ তারিখ রাত ১১ টার পর তাঁকে পিজি হাসপাতালে আনা হয়। আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ-রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। প্রায় ৮৪ বছর বয়সী আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর হার্টে পাঁচটি রিং পরানো ছিল। এতো সিরিয়াস একজন রোগীকে যথাযথ চিকিৎসা দেয়নি কারা কর্তৃপক্ষ। ২০১৯ সালের পর থেকে শাহাদাত পর্যন্ত তাঁর কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। ১৩ আগস্ট রাত ১১ টায় পিজি হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর থেকে পরিবারকে তাঁর শারিরীক অবস্থা সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে দেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁর অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার পরিবারের সাথে কাউন্সিলিং করা ও অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। ১৪ আগস্ট রাত ৯ টায় পরিবারকে জানানো হয় তিনি ৮ টা ৪০ মিনিটে ইন্তেকাল করেছেন। আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রহ-এর চিকিৎসা নিয়ে তাঁর পরিবার ও দেশবাসীর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। আল্লামা সাঈদীর বিপুল জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে ১৪ আগস্ট ২০২৩ তারিখে তাঁর শাহাদাতের পর ঢাকায় জানাজা করতে দেয়নি ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকার। তারা রাতের আঁধারে আল্লামা সাঈদীর লাশ পিরোজপুরে নিয়ে গিয়ে দাফন করে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু সাঈদী ভক্তদের প্রতিরোধের মুখে পুলিশ তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে পারেনি। আল্লামা সাঈদীর শাহাদাতের খবর শুনে মুহূর্তেই হাজার হাজার মানুষ পিজি হাসপাতাল ও শাহবাগ এলাকায় জমায়েত হয়। তারা সারারাত আল্লামা সাঈদী মৃতদেহ পাহারা দেয়। ১৫ আগস্ট সকালে ফজর নামাজ শেষে পুলিশ পিজি হাসপাতালে তান্ডব চালায়। কোনো যুদ্ধকবলিত এলাকায়ও যা হয় নি, পিজি হাসপাতালে সেই কাজটাই করেছে সরকার। তারা হাসপাতালে টিয়ার শেল, গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। হাজার হাজার রোগী শ্বাসকষ্টে পতিত হয়েছিল। ফজরের পর মুহুর্মুহু গুলি করে তারা আল্লামা সাঈদীর লাশ ছিনিয়ে পিরোজপুর নিয়ে যায়। পিরোজপুরে আল্লামা সাঈদীর জন্মভূমিতে লাখ লাখ জনতা উপস্থিত ছিল। পুলিশ সেখানে গিয়েই দ্রুত কোনোমতে দাফন করে দিতে চায়। কিন্তু জনগণ আল্লামা সাঈদীর ছেলেদের জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য করে পুলিশকে। অবশেষে পিরোজপুরে দুপুর ১ টায় ১ম জানাজা ও দুপুর ২ টায় ২য় জানাজা শেষে তাঁকে আল্লামা সাঈদীর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষকে কাঁদিয়ে নশ্বর দুনিয়া থেকে ইন্তেকাল করেছেন আল্লামা সাঈদী। আল্লামা সাঈদী শুধু একজন আলেম ছিলেন না তিনি ছিলেন বিশ্বখ্যাত বিপ্লবী। তাঁর তাফসীরুল কুরআন মাহফিল শুধু মানুষের অন্তরে নয় গোটা জগতে সাড়া ফেলেছিল। তাঁর শাহাদাতে সারাবিশ্বের ইসলামপ্রিয় মানুষ শোক প্রকাশ করেছে। বিশ্বের সবক’টি ইসলামী আন্দোলন, বিশ্বখ্যাত আলেম ও দা’ঈগণ তাঁর শাহদাতে আবেগঘন বক্তব্য ও বিবৃতি দিয়েছেন। মহান রাব্বুল আলামীন এই মহান দা’ঈকে কবুল করুন, তাঁকে জান্নাতে সুমহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করুন। শুহাদা, সালেহিন, সিদ্দিকিন ও নবীগণের সাথে তাঁকে সম্মানিত করুন। আমিন।

শহীদ আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ

শহীদ প্রোফাইল

আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ

এই ভূখণ্ডে বিভিন্ন আন্দোলন, সংগ্রাম, জাতির উত্থান-পতন, প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামে জনাব মুজাহিদ একটি অকুতোভয় নাম। তিনি আধিপত্যবাদ বিরোধী চেতনার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। বাংলার জমিনে নাস্তিকতাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের রক্তচক্ষু মোকাবিলা করে তৃণমুল থেকে গড়ে উঠে আসা একজন সংগ্রামী প্রাণপুরুষ। হাসিনা সরকার শুধুমাত্র আদর্শিক কারণেই ইসলামী আন্দোলনের এই জনপ্রিয় নেতাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবার পাঁয়তারা করছে। কিন্তু শহীদদের দুনিয়া থেকে সরানো যায় না। তাঁরা জীবিত। তাদের মরণ নাই। মানুষকে যুগ যুগ ধরে প্রেরণা দেবার জন্যই জন্ম। ব্যক্তি জীবনে অল্পে তুষ্ট, নির্লোভ, পরোপকারী, দৃঢ়চেতা, সংগ্রামী জননেতা মোহাম্মদ মুজাহিদ খুব অল্প সময়ে ৫৫ হাজার বর্গমাইলের এই জনপদের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। নিজের কর্ম তৎপরতায় সদা তৎপর তিনি। তিনি মৃত্যুদন্ড বহাল রাখার রায় শুনে আইনজীবীদের কাছে বললেন- ‘সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শাস্তির জন্য আমি মোটেই বিচলিত নই। আমি পত্রিকার মাধ্যমে অবহিত হয়েছি যে, আপিল বিভাগে আমার পক্ষে আইনজীবীরা যথেষ্ট বলিষ্ঠভাবে এবং দৃঢ়তার সাথে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ঐসব মিথ্যা অভিযোগে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপক্ষ আমার বিরুদ্ধে আনীত কোনো অভিযোগই প্রমাণ করতে পারেনি। এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ট্রাইব্যুনালে জেরার সময় স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশের কোথাও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সংঘটিত কোনো অপরাধের সাথে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না। এমনকি আমি আদৌ আল বদর, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল শামস বা এই ধরনের কোনো সহযোগী বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম এমন কোনো তথ্য তিনি তার তদন্তকালে পাননি। এর পরও আমার মৃত্যুদণ্ড বহাল। আমি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমি আল্লাহকে হাজির নাজির জেনে বলছি, আমার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ শতভাগ মিথ্যা ও বানোয়াট। ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন সময়ে কোন ধরনের অপরাধের সাথে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না। প্রতিদিন বাংলাদেশে শত শত লোক স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। এসব মৃত্যুর সাথে ফাঁসির আদেশের কোনো সম্পর্ক নেই। কখন, কার, কিভাবে মৃত্যু হবে সেটা একমাত্র আল্লাহ তায়ালা নির্ধারণ করেন। আল্লাহর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো সাধ্য কারো নেই। সুতরাং ফাঁসির আদেশে কিছু যায় আসে না। আমি মৃত্যুদন্ড বহাল রাখার ঘোষণায় উদ্বিগ্ন নই। অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা গোটা মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল। সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে যে শাস্তির ব্যবস্থা করেছে তার জন্য আমি মোটেই বিচলিত নই। আমি আল্লাহর দ্বীনের উদ্দেশ্যে আমার জীবন কুরবান করার জন্য সব সময় প্রস্তুত আছি।’ শিক্ষা: আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ জন্ম গ্রহণ করেন ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি। তিনি তার পিতা, প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আব্দুল আলীর কাছে তার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। একজন ধর্মীয় নেতা ও আধ্যাত্মিক পুরুষ হিসেবে মাওলানা আব্দুল আলীকে আজও ফরিদপুরসহ গোটা অঞ্চলের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তিনি শুধু ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না বরং জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৬২-১৯৬৪ সাল পর্যন্ত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যও (এমপিএ) নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে, জনাব আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ফরিদপুর ময়জুদ্দিন স্কুলে ভর্তি হন এবং তারও পরে তিনি ফরিদপুর জেলা স্কুলে অধ্যয়ন করেন। মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশুনা সুসম্পন্ন করার পর তিনি ফরিদপুরে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং স্নাতক ডিগ্রী শেষ করার পর তিনি ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় আগমন করেন। জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাত্র দুই-আড়াই মাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ক্লাস করার পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় জনাব মুজাহিদ আর সেখানে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রী লাভ করেন। ছাত্র রাজনীতি: ছাত্র জীবন থেকেই জনাব মুজাহিদ রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। শুরুতে রাজেন্দ্র কলেজে কিছুদিন এনএসএফ এ কাজ করার পর তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের সাথে যুক্ত হন। ১৯৭০ এর ডিসেম্বরে যখন তিনি ফরিদপুর ছাড়েন তখন তিনি ফরিদপুর জেলায় ছাত্রসংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। ঢাকায় এসে তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা জেলার সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭১ সালের জুলাইতে ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক সেক্রেটারি (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) মনোনীত হন এবং এর মাত্র দুই মাস পর অক্টোবরে তিনি ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক সভাপতি নির্বাচিত হন। জামায়াতে যোগদান: ছাত্রজীবন শেষ করার পরপরই আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৮২-১৯৮৯ পর্যন্ত ঢাকা মহানগরী জামায়াতের আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। প্রাথমিক কর্মজীবন: জনাব আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ তার পেশাগত জীবন শুরু করেন নারায়ণগঞ্জ আদর্শ স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে। এর আগে ১৯৭৩-১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এই আদর্শ স্কুল প্রতিষ্ঠায় তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। স্কুলের জন্য আর্থিক সংস্থান ও ছাত্র সংগ্রহে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তার ঐকান্তিক চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের কারণে আদর্শ স্কুল আজও নারায়ণগঞ্জ জেলায় সর্বশ্রেষ্ঠ স্কুল হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি নারায়ণগঞ্জের আদর্শ স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে সাংগঠনিক প্রয়োজনে তিনি ঢাকায় স্থানান্তরিত হন। গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি দৈনিক সংগ্রামের চেয়ারম্যান এবং সাপ্তাহিক সোনার বাংলার পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। গ্রেফতার হওয়ার কিছু দিন পূর্বে তিনি ’রাইজিং সান’ নামক একটি ইংরেজি পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করছিলেন। পত্রিকাটির ডামি ভার্সন তখন প্রকাশিত হচ্ছিল। জনাব মুজাহিদ গ্রেফতার হয়ে যাওয়ায় পত্রিকাটি আজও আলোর মুখ দেখেনি। জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা: আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বরাবরই দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ও ছাত্র আন্দোলনে, ১৯৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে, ১৯৯৪-১৯৯৬ কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে, ২০০০ সালে জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার আন্দোলনে এবং ২০০৭ সালে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর পাশাপাশি, জনগনের মৌলিক সমস্যা ও জাতীয় সমস্যা নিরসনেও তিনি সক্রিয় অবদান রাখেন। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন: আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং মন্ত্রী হিসেবে সফলতার সাথে ৫ বছরের মেয়াদ সম্পন্ন করেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকালীন তিনি নিন্মোক্ত সরকারি কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কমিটিগুলো হচ্ছে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ, নির্বাহী কমিটি-জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক), জাতীয় নারী উন্নয়ন কাউন্সিল, অর্থনীতি সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটি, নারী উন্নয়ন এবং নারী অধিকার বিষয়ক জাতীয় কমিটি, কারা সংস্কার কমিটি, এসিড ও মাদক নিয়ন্ত্রন জাতীয় কমিটি, ক্ষুদ্র ঋণ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি, বয়স্ক ভাতা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এবং কিশোর অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রন সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকালীন সময়ে তিনি মাদারীপুর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সামাজিক কার্যক্রম: নিঃস্বার্থ একজন সমাজ সেবক হিসেবে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ব্যাপক সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। দেশজুড়ে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং মসজিদ ও এতিমখানা বিনির্মাণে তার সক্রিয় ভূমিকা জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তার নিজ জেলা ফরিদপুরে তিনি ৫০ টিরও বেশি মসজিদ নির্মাণে ভূমিকা পালন করেন। দেশী ও বিদেশী বিভিন্ন দাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তিনি এই ব্যাপক সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। মাদ্রাসা ছাত্রদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কারণে ২০০২ সালে তৎকালীন চার দলীয় জোট সরকার ফাজিলকে বিএ সমমানের এবং কামিলকে মাস্টার্স মানে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন ধরনের আর্থ-সামাজিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্মাণেও তার ভূমিকা সক্রিয় ছিল। তার প্রচেষ্টা ও দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণে ফরিদপুর ও মাদারীপুরের মত অবহেলিত জেলা দুটিতে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালিত হয়। অগণিত রাস্তা, সড়ক ও মহাসড়ক, মাদরাসা, ব্রীজ, কালভার্ট ও মসজিদ এই সময় এই এলাকাগুলোতে নির্মিত হয়। তিনি মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায় বিভাগীয় সমাজ সেবা কেন্দ্র এবং হাজী শরীয়তউল্লাহ ব্রীজ উদ্বোধন করেন। মন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে জনাব মুজাহিদ দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনি নিয়মিতভাবেই তার মন্ত্রণালয়ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সারপ্রাইজ ভিজিটে যেতেন। এর মাধ্যমে তিনি মন্ত্রণালয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তাদের দুর্নীতি কমানোর চেষ্টা করেছেন এবং তাতে তিনি অনেকটা সফলও হয়েছেন। তার মেয়াদে তিনি বাংলাদেশের ৬৪ টি জেলায় ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক শিশু সদন (সরকারি এতিমখানা) নির্মাণ করেন। যা সমাজের ভাগ্যহত ও অনগ্রসর কিশোর কিশোরীদের উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসতে ব্যপকভাবে সাহায্য করে। ২০০১ সালে যখন জনাব আলী আহসান মো: মুজাহিদ সমাজকল্যান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন, তখন তা একটি দুর্বল বা লো প্রোফাইল মিনিস্ট্রি হিসেবে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু তার ৫ বছরের মেয়াদের শেষে এটি হাই প্রোফাইল তথা আলোচিত মন্ত্রণালয়ে পরিণত হয়। মন্ত্রণালয়ের বাজেট মাত্র ৫ বছরে ৫ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। এগুলো সবই হয় মন্ত্রী হিসেবে তার একনিষ্ঠ ও সফলতার কারণে। তিনি তার মন্ত্রিত্বের ৫ বছরে ছোট খাট নানা অনুষ্ঠান ছাড়াও ৪০টিরও বেশি আলোচিত প্রোগ্রাম করেন যেখানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যোগ দেন। তার নেতৃত্বে ২০০৪ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম প্রতিবন্ধী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি ’মুক্তা’ নামক একটি মিনারেল ওয়াটারেরও প্রবর্তন করেন। যা প্রতিবন্ধীদের দ্বারা প্রস্তুতকৃত এবং বাজারজাতকৃত। তার এই উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশের নাম তখন বিশ্ব দরবারে ভিন্নভাবে আলোচিত ও প্রশংসিত হয়। তার সময় প্রতিবন্ধী অলিম্পিকেও বাংলাদেশ সফলতা অর্জন করে। এছাড়া সুদ মুক্ত ঋণ ও এসিডদগ্ধদের মধ্যে ব্যপকভাবে ভাতা প্রদান করা হয় তার সময়ে। জনাব মুজাহিদ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ঘুরে ঘুরে নিজে এই ভাতা বিতরণ করতেন। তাই তার সময়ে গ্রামের অভাবী মানুষ সুদখোর মহাজন এবং বেসরকারি সংস্থার হাত থেকে মুক্ত হয়ে সরকারের কাছ থেকে বিশেষত সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হাত থেকে ঋণ নিতে শুরু করে। কিন্তু পরবর্তীতে এই উন্নয়নমূলক কার্যক্রমগুলো বন্ধ হয়ে যায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে। প্রকাশনা: আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ একজন জনপ্রিয় এবং স্বনামধন্য লেখক। তার ৩টি বই ভীষণভাবে পাঠক সমাদৃত হয়। বইগুলো হলো, আজকের মুসলমান: ইসলামের দাবী, বিশ্বব্যপী ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতে ইসলামী এবং তুরস্ক সফর। জনাব মুজাহিদ ইসলামী শিক্ষা, আর্থ সামাজিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুর উপরও নিয়মিতভাবে লেখালেখি করেছেন। ভ্রমণ: জনাব মুজাহিদ ২০টিরও বেশি দেশে ভ্রমণ করেছেন। এই সব দেশে তিনি গণ্যমান্য, প্রভাবশালী এবং ইসলামী নেতৃবৃন্দের সাথেও সাক্ষাৎ করেন। তার ভ্রমণকৃত উল্লেখযোগ্য দেশের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমীরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, জাপান,থাইল্যান্ড এবং তুরস্ক। বৈবাহিক অবস্থা: আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ১৯৭৩ সালের ১৮ অক্টোবর বেগম তামান্না-ই-জাহানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তামান্না-ই-জাহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মহানগরী মহিলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তামান্না-ই-জাহান একজন গৃহিণী এবং পড়ুয়া মানসিকতার একজন নারী যিনি নিয়মিতভাবে পত্র পত্রিকায় লেখালেখি করেন। জনাব মুজাহিদ ৩ পুত্র ও এক মেয়ে সন্তানের জনক। শহীদ মুজাহিদের শেষ কথাঃ আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া। জেল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ যে তারা এই সাক্ষাতের সুযোগ করে দিয়েছেন। জেল কর্তৃপক্ষ আসলে অসহায়। তারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এই পর্যন্ত আমাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছেন এবং আমার সাথে ভাল ব্যবহার করেছেন। তারা আমাকে একটি লিখিত আবেদনের জন্য যথেষ্ট পীড়াপীড়ি করেন এবং বলেন এটা না হলে তাদের অসুবিধা হয়ে যাবে। এক পর্যায়ে তারা বলেন, আপনার যা বক্তব্য আছে তাই লিখে দেন। আর সেই কারনেই এটা বলার পর আমি কনসিকুয়েন্স বুঝেও আমি তাদের সুবিধার জন্য একটি লিখিত আবেদন দিয়েছি। আমি রাষ্ট্রপতিকে লিখেছি, আইসিটি এ্যাক্ট, যদিও এটা অবৈধ ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক তারপরও এই বিচারের সময় আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সীমিত সুযোগ দেয়া হয়েছে। আমার ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইন, সাক্ষ্য আইন প্রযোজ্য ছিলনা। সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমাকে ট্রাইবুনাল ৬ নং চার্জে মৃত্যুদন্ড দেয়নি। তারা চার্জ ১ কে চার্জ ৬ এর সাথে মিলিয়ে চার্জ ৬ এ মৃত্যুদন্ড দিয়েছে। আপীল বিভাগ আমাকে চার্জ ১ থেকে বেকসুর খালাস দিয়েছে। চার্জ ৬ এ তারা আমার মৃত্যুদন্ড বহাল রেখেছে। অথচ ট্রাইবুনাল শুধু চার্জ ৬ এর জন্য আমাকে মৃত্যুদন্ড দেয়নি। এই চার্জে স্বাক্ষী মাত্র একজন। সে বলেনি, যে কোন বুদ্ধিজীবিকে আমি হত্যা করেছি। কোন বুদ্ধিজীবি পরিবারের সন্তানও এসে বলতে পারেনি যে আমি কোন বুদ্ধিজীবিকে মেরেছি। এবং কোন বুদ্ধিজীবি পরিবারও আমার রায়ের পরও দাবী করেনি যে তারা তার পিতা হত্যার বিচার পেয়েছেন। আমার অপরাধ হিসেবে বলা হয়েছে যে আমি নাকি আর্মী অফিসারদের সাথে বসে পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু যে স্বাক্ষী এসেছে সেও বলেনি যে আমি কবে কোন আর্মি অফিসারের সাথে কোথায় বসে এই পরামর্শ করলাম? সাক্ষী বলেছে আমাকে, নিজামী সাহেব ও অধ্যাপক গোলাম আযমকে দেখেছে। সে আমাদের চিনতো না। পরে আমাদের নাম শুনেছে। অথচ এই অভিযোগটি গোলাম আযমের সাহেবের বিরুদ্ধে আনাই হয়নি। নিজামী ভাইকে যাবজ্জীবন দিয়ে শুধু আমাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। আমি নিশ্চিত যে আমার মৃত্যুদন্ডের রায় কনফার্ম করে তারপর আমার বিরুদ্ধে বিচারের নামে প্রহসন শুরু করা হয়েছে। আমাকে আমার পরিবার, সংগঠন ও দেশবাসীর কাছে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য, কাপুরুষ প্রমান করার জন্য দিনভর রাষ্ট্রীয়ভাবে এই মিথ্যাচারের নাটক করা হয়েছে। এই জালিম সরকারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসেনা। আমি নির্দোষ, নির্দোষ এবং নির্দোষ। আমাদের আজ তারা অন্যায় ভাবে হত্যা করতে যাচ্ছে। কত বড় স্পর্ধা তাদের যে তারা মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার করার দাবী করে। অথচ তাদের নিজেদের ভেতর মানবতা নেই। তারা ঘুমন্ত অবস্থায় একজন মানুষকে মধ্যরাতে তুলে তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসে বলে এই তাদের শেষ সাক্ষাত এবং এরপরও তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হবে। তোমরা শুনে রাখো, আজ যদি আমার ফাঁসি কার্যকর করা হয় তাহলে তা হবে ঠান্ডা মাথায় একজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা। তোমরা প্রতিহিংসাপরায়ন হবানা। তোমাদের কিছুই করতে হবেনা। আজ আমার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার পর এই অন্যায় বিচারিক প্রক্রিয়ার সাথে যারা জড়িত তাদের প্রত্যেকের বিচার আল্লাহর দরবারে শুরু হয়ে যাবে, বিচার শুরু হয়ে গেছে। তোমাদের কারও কিছু করতে হবেনা। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মত এত বড় নেয়ামত দুনিয়াতে আর একটিও নেই। আমার জানামতে এই সংগঠন দুটি পৃথিবীর মধ্যে সেরা সংগঠন। এই সংগঠনের ব্যপারে আমি সন্তুষ্ট। গত কয়েক বছরে অনেক নেতাকর্মী শহীদ হয়েছে, হাজার হাজার নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, আমার মত জেলখানায় আছে কয়েক হাজার মানুষ। বিশেষ করে ইসলামী ছাত্রশিবির বিগত ৫ বছরে যে ভুমিকা রেখেছে, যে স্যাক্রিফাইস করেছে তা অতুলনীয়। আমার শাহাদাত এই দেশে ইসলামী আন্দোলনকে সহস্রগুন বেগবান করবে এবং এর মাধ্যমে জাতীয় জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে ইনশাল্লাহ। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে যারা স্বাক্ষী দিয়েছেন, তাদের মধ্যে দুইজন ছাড়া বাকি সবাই দরিদ্র। তারা মূলত অভাবের তাড়নায় এবং বিপদে পড়ে মিথ্যা স্বাক্ষ্য দিতে বাধ্য হয়েছেন। আমি তাদের সবাইকে মাফ করে দিলাম, তোমরাও কোন ক্ষোভ রাখবা না। পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেনঃ তোমরা নামাজের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস থাকবা। তোমরা সব সময় হালাল রুজির উপর থাকবা। কষ্ট হলেও হালাল রুজির উপর থাকবা। আমি ৫ বছর মন্ত্রী ছিলাম, ফুল কেবিনেট মন্ত্রী ছিলাম। আল্লাহর রহমতে, আল্লাহর রহমতে, আল্লাহর রহমতে আমি সেখানে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে, পরিশ্রম করে আমার দায়িত্ব পালন করেছি। কেউ আমার ব্যপারে বলতে পারবেনা যে আমি অন্যায় করেছি। অনেক দুর্নীতির মধ্যে থেকেও আমার এই পেটে (নিজের শরীরের দিকে ইংগিত করে) এক টাকার হারামও যায়নি। তোমরাও হালাল পথে থাকবা। তাতে একটু কষ্ট হলেও আল্লাহ বরকত দিবেন। আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক সিলাই রেহীমি। আত্মীয় স্বজনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে মিলে মিশে চলবে। আত্মীয়দের মধ্যে অনেকেই নামাজ পড়বে, অনেকেই কম। কেউ কেউ হালাল উপার্জনের ব্যপারে অত্যধিক কড়া হবে আবার কেউ কেউ একটু দুর্বল থাকবে। শরীয়তে দুই রকম। আজিমাত এবং রুকসাত। আজিমাত হলো খুবই কড়া, কোন অবস্থাতেই সে হারামের কাছে যাবেনা। আর রুকসাত হলো পরিবেশ ও পরিস্থিতির জন্য একটু ঢিল দেবে। তাই আত্মীয়দের মধ্যে কারও আয়ে সমস্যা থাকবে, কারও নামাজে দুবর্লতা থাকবে। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো তাদেরকে সঠিক পথে আনার জন্য সবার সাথে সম্পর্ক ঠিক রেখে মিলে মিশে চলা। আমি সব সময় এভাবে চলেছি এবং তাতে ভাল ফল পেয়েছি। হাদীসে আছে, আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা। প্রতিবেশীর হক আদায় করবে। আমার ঢাকার বাসা, ফরিদপুরের বাড়ীর প্রতিবেশীদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে। আমার উত্তরার বাসার ব্যাপারে তো আমি আগেই লিখে দিয়েছি। মৌলিক কোন চেঞ্জ দরকার নেই। শুধু প্রয়োজন অনুযায়ী মূল ভিত্তি ঠিক রেখে তোমরা সুবিধা মতো এদিক ওদিক চেঞ্জ করে নিও। ফরিদপুরের বাড়ী নিয়েও যেভাবে বলে দিয়েছি, সেভাবেই তোমরা কাজ করবে। আমরা ভাই ভাইদের মধ্যে কোন সম্পত্তি নিয়ে কখনো ঝামেলা হয়নাই। তোমরাও মিলেমিশে থাকবে। এসব নিয়ে কোন সমস্যা করবানা। শান্তির জন্য কাউকে যদি এক হাত ছাড়তেও হয়, তাও কোন ঝামেলা করবেনা, মেনে নিবে। বেশী বেশী করে রাসুল (সা) এর জীবনী ও সাহাবীদের জীবনী পড়বে। আমি জানি তোমরা পড়েছো, কিন্তু তাও বার বার পড়বে। বিশেষ করে পয়গম্বর-এ-মোহাম্মাদী, মানবতার বন্ধু হযরত মোহাম্মাদ (সা:), সীরাতে সারওয়ারে আলম, সীরাতুন্নবী, সীরাতে ইবনে হিশাম, রাসুলুল্লাহর বিপ্লবী জীবন। আর সাহাবীদের জীবনীর উপরও ভাল বই আছে। আগে পড়েছো জানি, তাও তোমরা পড়ে নিও।আমি আমার সন্তানদের উপর সন্তুষ্ট। তোমাদের ভুমিকার ব্যপারে সন্তুষ্ট। আইনজীবীদেরকে আমার ধন্যবাদ ও দোয়া দেবে। তারা অনেক পরিশ্রম করেছেন। তাদের ভুমিকার ব্যপারে আমি সন্তুষ্ট। আইনজীবীরা যেভাবে পরিশ্রম করেছে, অবিশ্বাস্য। ওনারা যদি টাকা নিতো তাহলে ৫-১০ কোটি টাকার কম হতোনা। কিন্তু তারা অলমোস্ট বিনা পয়সায় তারা সাহসিকতার সাথে এই আইনী লড়াই চালিয়ে গেছেন। আমার জানামতে শহীদের মৃত্যুতে কষ্টের হয়না। তোমরা দোয়া করবে যাতে আমার মৃত্যু আসানের সাথে হয়। আমাকে যেন আল্লাহর ফেরেশতারা পাহারা দিয়ে নিয়ে যান।

শহীদ মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুস সুবহান

শহীদ প্রোফাইল

মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুস সুবহান

১৪ ফেব্রুয়ারি। বাংলাকে গড়তে যারা তাদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন এমন একজন মহামানবের আজ শাহদাতবার্ষিকী। পাবনার মাওলানা আবদুস সুবহান এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি ইতিহাস। ১৯৬২ সাল থেকে এ জনপদের জনগণ তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরুপ তাকে বারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছেন, যা পাবনার অন্য কোন নেতার ক্ষেত্রে হয়নি। তাঁর জীবনের মিশনই ছিল জনকল্যানমূলক কাজ; শিক্ষা, সেবা ও বৃত্তিমূলক কাজের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে এলাকার জনসাধারনকে শিক্ষিত করে তোলা এবং বেকারত্ব দূর করা। এমন একজন জনপ্রিয় আলেমে দ্বীনকে সহ্য করতে পারেনি কোনো স্বৈরাচারী সরকার। আইয়ুব, শেখ মুজিব, হাসিনা প্রতিটি মাফিয়া সরকারের বিরুদ্ধে তিনি লড়েছেন। বিনিময়ে ভয়ংকর নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। দীর্ঘদিন হাসিনা তাঁকে বন্দি রেখে, বিনা চিকিৎসায় অত্যন্ত নির্দয়ভাবে পাবনার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতাকে ২০২০ সালে খুন করেছে। জন্ম ও শৈশব মাওলানা আবদুস সুবহান ১৯২৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাবনা জেলার সুজানগর থানার তৈলকুন্ডু (বর্তমান মমিনপারা) গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম মৌলবী নাঈম উদ্দিন আহমেদ একজন দ্বীনদার পরহেজগার আলেম ছিলেন। ১৯৬৫ সাল থেকে পাবনা শহরের গোপালপুর (পাথরতলা) স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তারা। বর্তমানে তাঁর পরিবার-পরিজন সেখানেই বসবাস করছে। শিক্ষা জীবন তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় সুজানগরের রামচন্দ্রপুর মক্তবে পরে তিনি মানিকহাট ও মাছপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন ১৯৪১ সালে তিনি উলাট মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং প্রায় সাত বছর মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে ১৯৪৭ সালের জুনিয়র পাস করেন তিনি শিবপুর মাদ্রাসা থেকে। ১৯৫০ সালে আলিম পাস করেন তিনি সিরাজগঞ্জ আলিয়া মাদ্রাসা থেকে, ১৯৫২ সালে ফাজিল, ১৯৫৪ সালে কামিল পাস করেন। মাওলানা আবদুস সোবহান অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি জুনিয়র মেট্রিকুলেশন আলিম ও ফাজিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। কামিল পরীক্ষায় মাদ্রাসা বোর্ড থেকে হাদিস গ্রুপে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। কর্মজীবন মাদ্রাসা বোর্ড থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ১৯৫২ সালে হেড মাওলানা হিসাবে পাবনা আলিয়া মাদ্রাসায় যোগদান করেন অতঃপর তিনি গোপাল চন্দ্র ইনস্টিটিউট আরিফপুর সিনিয়র মাদ্রাসায় সুপারিনটেনডেন্ট ও মাগুরা জেলার বররিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। সবশেষে তিনি আরিফপুর ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করে শিক্ষকতা জীবনের সমাপ্তি টেনে সক্রিয় রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। তিনি ১৯৫২ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছর সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক জীবন মাওলানা আবদুস সুবহান ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার পাবনা জেলার সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫১ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন এবং পর্যায়ক্রমে বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দীর্ঘদিন পাবনা জেলা আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। পরে নিখিল পাকিস্তান কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা, কর্মপরিষদ ও নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৬১ সালে গয়েশপুর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার নির্বাচিত হন ১৯৬২ সালে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন, ১৯৬৫ সালে তিনি পুনরায় প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিরোধী দলের সিনিয়র ডেপুটি লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯১ সালে বিপুল ভোটে পাবনা সদর আসনের এমপি নির্বাচিত হন। তিনি প্রথম সর্বোচ্চ ভোটে জয়লাভ করেন এবং সংসদে জামায়াতে ইসলামের উপনেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে আবারো এমপি নির্বাচিত হন। মাওলানা আদুস সোবহান ২০০১-০৬ মেয়াদে সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। সামাজিক কর্মকাণ্ড ছাত্রজীবন থেকেই মাওলানা আবদুস সোবহান সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৫৬ সালে তিনি আঞ্জুমানে রফিকুল ইসলাম নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন ১৯৬৮ সালে তিনি জালালপুর জুনিয়ার হাই স্কুল ও বিবেকানন্দ বিদ্যাপীঠ নামের প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। তিনি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। মাওলানা আবদুস সুবহানের আরো একটি বড় অবদান হচ্ছে পাবনা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল। ১৯৬৭ সালে পাবনার জালালপুরে তিনি এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন বর্তমানে স্কুলটি পাবনা ক্যাডেট কলেজে উন্নীত হয়েছে। তিনি পাবনা দারুল আমান ট্রাস্ট এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। এই ট্রাস্ট কর্তৃক পরিচালিত পাবনা ইসলামিয়া মাদ্রাসা ইসলামিয়া এতিমখানা ইসলামিয়া ডিগ্রী কলেজ ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার হেফজখানার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ইমাম গাজ্জালী গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ, কিন্ডার গার্ডেন স্কুল কলেজ, আল-কোরআন ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ছিলেন, তিনি পাবনা সদর গোরস্থান কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পাবনা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহ-সভাপতি ছিলেন। উল্লেখ্য তিনি নিজের জমি লিখে দিয়ে পাবনার সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজ। এই কলেজের আগের নাম ছিল ইসলামিয়া কলেজ। ১৯৭২ সালে শেখ মুজিব এই কলেজের নাম পরিবর্তন করে। শেখ মুজিব এভাবে সকল প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করেন যেগুলোর নামে ইসলাম বা মুসলিম ছিল। এছাড়াও মাওলানা আবদুস সুবহান সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ এবং ঈশ্বরদি সরকারি কলেজ (প্রাক্তন জিন্নাহ কলেজ)সহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ হাতে গড়েছেন। জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে পাবনার অসংখ্য রাস্তা-ঘাট ব্রীজ-কালভার্ট নির্মাণ করে তিনি পাবনার মানুষের কষ্ট লাঘব করেছেন। তার গড়া দারুল আমান ট্রাস্ট বর্তমান শিক্ষা নগরী হিসেবে পরিচিত, সেখানে তার ব্যক্তিগত প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে মসজিদে তাকওয়া নামে একটি অত্যাধুনিক মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। পাবনা ক্যালিকো কটন মিল তাঁর প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও তিনি বহু মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছেন। তিনি এলাকার রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়নের কাজ করেছেন। পাবনা ক্যাডেট কলেজ হতে গয়েশপুরের রাস্তা, কালিদহ হতে ভাঁড়ারা রাস্তা, কুচিয়ামোড়ার তেমাথা হতে সাদুল্লাপুর রাস্তা, ৮ মাইল হয়ে টিকরী-দাপুনিয়া রাস্তা তাঁর কর্মতৎপরতার স্বাক্ষর বহন করে। মাওলানা আদুস সুবহান পুরাতন পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে কোমরপুর পদ্মা নদীর তীর পর্যন্ত রাস্তা পাকা করেছেন, যা পাবনার চর এলাকার মানুষের কাছে একসময় ছিল কল্পনাতীত। বাংলাদেশ চাষিকল্যাণ সমিতি ও বাংলাদেশ তাঁতি কল্যাণ সমিতির তিনি সহ সভাপতি ছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। তিনি দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। তিনি পাবনা মহিলা মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা। মাওলানা আদুস সুবহান ঢাকাস্থ পাবনা সমিতির আজীবন সদস্য, ইত্তেহাদুল উম্মাহর প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। তিনি মুসলিম এইড লন্ডন এর বাংলাদেশ শাখার চেয়ারম্যান ছিলেন এবং ইসলামিক ‘ল’ রিসার্চ সেন্টার এবং লিগ্যাল এইড বাংলাদেশ-এরও চেয়ারম্যন ছিলেন। তিনি জাতীয় শরীয়াহ কাউন্সিলের সদস্য এবং আল আমান ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, ত্রৈমাসিক গবেষণা পত্রিকা ইসলামী আইন ও প্রচার পত্রিকার তিনি উপদেষ্টা সম্পাদক। লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড একজন সুলেখক হিসেবেও মাওলানা আব্দুস সুবহানের পরিচিতি রয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি চিন্তাশীল প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। একসময় তিনি সাংবাদিকতার সাথেও জড়িত ছিলেন। মাওলানা আদুস সুবহান বাংলা ছাড়াও আরবী, উর্দু, ফার্সি, ইংরেজি সহ বেশ কয়েকটি ভাষা জানতেন। একজন সংস্কৃতিপ্রেমী ও সংস্কৃতিসেবী হিসেবেও মাওলানা আব্দুস সুবহানের সুনাম রয়েছে। ছাত্রজীবনে তিনি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় ছিলেন। গান ও বক্তৃতা প্রতিযোগীতায় পুরস্কারও পেয়েছেন বহুবার। মাওলানা আদুস সুবহানেবর কৃতিত্ব বলে শেষ করার মত নয়। তিনি আওয়ামী মাফিয়া সরকারের তথাকথিত মানবতা বিরোধী মামলায় ফাঁসীর রায়ে দণ্ডিত হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে আবদ্ধ থেকেও তিনি কল্যাণময় কাজে পিছিয়ে ছিলেন না। তিনি তার সম্পত্তির একটি বড় অংশ বিক্রয় করে পাবনার প্রাণকেন্দ্র দারুল আমান ট্রাস্ট তথা ইসলামিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এতে প্রায় ৩ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়। মসজিদটিতে একসাথে প্রায় ৩ হাজার নামাজি নামাজ আদায় করতে পারেন। শুধু তাই নয় মাওলানা সাহেবকে কারাগারের মধ্যে যে ভাইটি সেবা যত্ন করতেন তার ব্যাপারে তিনি সন্তানদের কাছে অসিয়ত করে গেলেন – মামুন নামের ছেলেটি কারাগার থেকে বের হলে আমি জীবিত থাকি আর মারা যাই তোমরা আমার সম্পত্তি বিক্রি করে ছেলেটিকে ওমরা হজ্জ পালন করার ব্যাবস্থা করে দিবে। শাহাদাত মাওলানা আবদুস সুবহানকে ২০ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে ঢাকা থেকে পাবনা যাওয়ার পথে যমুনা সেতু এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে জালিম হাসিনা সরকার। এরপর তথাকথিত মানবতাবিরোধী মামলায় দীর্ঘদিন জালিম সরকারের মিথ্যা রায়ে কারাগারে আবদ্ধ থেকেছেন। প্রবীণ এই জিন্দাদিল মুজাহিদ কখনো জালিমের কাছে মাথানত করেননি। ফলস্বরুপ প্রতিটি জালিম আইয়ুব, শেখ মুজিব ও হাসিনা তাকে জুলুম নির্যাতনের মুখোমুখি করে। তিনি প্রতিটি মাফিয়া সরকারের বিরুদ্ধে তিনি লড়েছেন। বিনিময়ে ভয়ংকর নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। শেখ হাসিনা এই অসুস্থ নেতাকে চিকিৎসার ন্যূনতম ব্যবস্থাও করেননি। অবশেষে তিনি যখন মৃত্যুমুখে পতিত হন তখন তাঁকে বেড়ি ও হাতকড়া পরিয়ে হাসপাতালে এনে চিকিৎসার নামে আর বেশি নির্যাতন শুরু করে। অবশেষে হাজারও ঈমানী পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মহান রবের মন জয় করে সেই রবের সাথে সাক্ষাতের জন্য দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। জালিমদের আল্লাহ তায়ালা সর্বোচ্চ সুযোগ দেন। ছাড় দেন তবে অবশ্যই ছেড়ে দেন না। ইনশাআল্লাহ হাসিনা ও তার মাফিয়া গ্যাং অবশ্যই ফেরাউনের পরিণতি বরণ করবে।

শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান

শহীদ প্রোফাইল

মুহাম্মদ কামারুজ্জামান

শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান রহ.। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন প্রতিভাবান যোদ্ধা। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২য় কেন্দ্রীয় সভাপতি। তাঁর চমৎকার লেখনির মাধ্যমে আমরা সমাজ, সভ্যতা ও পাশ্চাত্যের নানা অসঙ্গতির ইতিহাস জানাতে সক্ষম হয়েছি। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুণগত পরিবর্তন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার লড়াইয়ে তিনি ছিলেন অন্যতম। দেশে-বিদেশে সভা-সেমিনারে তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী উপস্থাপনা সেক্যুলার ও বামপন্থীদের ইসলামী আন্দোলনের ব্যাপারে হিংসা বাড়িয়ে দিয়েছে। এভাবেই তিনি জালিমদের হিটলিস্টে চলে আসেন। তিনি ছিলেন একাধারে একজন রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখক, ইসলামী ব্যক্তিত্ব, সদালাপী প্রাণপুরুষ। শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান যেমন একদিকে সফল রাজনীতিবিদ ও সংগঠক অন্যদিকে একজন সফল সাংবাদিক ও সম্পাদক। রাজনৈতিক ময়দানে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের পাশাপাশি মুহাম্মদ কামারুজ্জামান বাংলাদেশের রাজনীতি, ইসলামী সংগঠন ও আন্দোলন, গণতন্ত্র ও তার বিকাশ, নির্বাচন, গণমাধ্যম, সমাজ সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রচুর চিন্তা ও গবেষণা করে চলেছেন। তিনি বাংলাদেশে অবাধ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাসহ ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও তার কৌশল নিয়ে বেশ কয়েকটি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। জন্ম ও শিক্ষা জীবন: মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালের ৪ জুলাই শেরপুর জেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের মুদিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম ইনসান আলী সরকার ও মাতা মরহুমা সালেহা খাতুন। তিনি শেরপুর জিকেএম ইন্সটিটিউশন থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন। তিনি প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বরাবরই প্রথমস্থান অধিকার করেছেন। অষ্টম শ্রেণীতে তিনি আবাসিক বৃত্তি পান। ১৯৬৭ সালে জিকেএম ইন্সটিটিউশন থেকে ৪টি বিষয়ে লেটারসহ এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং আবাসিক বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৭-৬৯ সেশনে জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেন। কিন্তু দেশে ’৬৯-এর গণআন্দোলন শুরু হওয়ায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। ১৯৭২ সালে মোমেনশাহী নাসিরাবাদ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা আইডিয়াল কলেজ থেকে ডিস্ট্রিংশনসহ বিএ পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবৃত্তি লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে কৃতিত্বের সাথে সাংবাদিকতায় এমএ পাস করেন। ছাত্র রাজনীতি: শেরপুরের বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্ব মরহুম কাজী ফজলুর রহমানের আহ্বানে জিকেএম ইন্সটিটিউটে নবম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন তিনি ইসলামী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেন। কলেজে পা দিয়েই তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি প্রথম ঢাকা মহানগরীর সভাপতি এবং পরে সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হন। ১৯৭৮ সালের ১৯ এপ্রিল ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং একমাস পরই নির্বাচনের মাধ্যমে সেশনের বাকি সময়ের জন্য কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৮-৭৯ সালেও শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে পুনঃনির্বাচিত হন। সাংবাদিকতা: ছাত্রজীবন শেষে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৮০ সালে তিনি বাংলা মাসিক ‘ঢাকা ডাইজেস্ট’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৮১ সালে তাকে সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। মাত্র ১ জন পিয়ন ও ১ জন কর্মচারী নিয়ে যাত্রা শুরু করে সোনার বাংলা। সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোনার বাংলায় ক্ষুরধার লেখনীর কারণে এরশাদের শাসনামলে পত্রিকাটির প্রকাশনা নিষিদ্ধ হয়। ‘সোনার বাংলা’ রাজনৈতিক কলাম ও বিশ্লেষণ বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং পত্রিকাটি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক সাপ্তাহিকের মর্যাদা লাভ করে। কারাগারে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মুহাম্মদ কামারুজ্জামান পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি নিজস্ব উদ্যোগে একটি ব্যতিক্রমধর্মী সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘নতুন পত্র’ প্রকাশ করেন। মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দশ বছর দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। মুহাম্মদ কামারুজ্জামান জাতীয় প্রেস ক্লাবের একজন সদস্য এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন। ১৯৮৫-৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি অবিভক্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে’র কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। ইসলামী আন্দোলন: পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ১৯৭৯ সালে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন, একই বছর তিনি জামায়াতের রুকন (সদস্য) হন। ১৯৮১-৮২ সালে তিনি কিছুদিনের জন্য ঢাকা মহানগরী জামায়াতের জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলেন। ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালে তাকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। জামায়াতের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কমিটি ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য হিসেবে বিগত স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ১৯৮৩-৯০ পর্যন্ত তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৩-৯৫ সাল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান জামায়াতের নির্বাহী কমিটি, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও বিভিন্ন কমিটির সদস্য এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসায় পর গঠিত চারদলের কেন্দ্রীয় লিয়াজোঁ কমিটির অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্য প্রচেষ্টায় তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। এজন্য দলীয় রাজনীতি ছাড়াও বিভিন্ন ফোরামে সভা-সমাবেশ, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে তার সক্রিয় উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। শেরপুরের জনগনের ম্যান্ডেট: ১৯৮৬ সাল থেকে শেরপুর সদর তথা শেরপুর-১ আসনে জনাব মুহাম্মদ কামারুজ্জামান প্রতিদ্বন্তিতা করে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়ে আসছেন। সর্বশেষ দুটি সাধারন নির্বাচনে(২০০১ ও ২০০৮) তিনি খুব অল্প ভোটের ব্যাবধানে হেরে গেলেও ধারনা করা হয় তিনিই প্রকৃত বিজয়ী। কারণ,ঐ দুই নির্বাচনেই আওয়ামীলীগ প্রার্থী তার নিয়ন্ত্রনাধীন এলাকার ভোট কেন্দ্রগুলো দখল করে ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে নেন। এত কিছুর পরও ২০০১ এর নির্বাচনে কামারুজ্জামান ৬৫,৪৯০ ভোট (বিজয়ী আওয়ামী প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ৮৬,১০১)এবং ২০০৮ এর ডিজিটাল নির্বাচনে ১,১০,০৭০ ভোট পান (বিজয়ী আওয়ামী প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ১,৩৬,১২৭)। ১৯৭১ সালে শেরপুরের নারকীয় ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী মানুষগুলো বেঁচে থাকতে শহীদ কামারুজ্জামানকে এত বিপুল ম্যান্ডেট দেয়া কি কোন অর্থ বহন করে না? যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে তা যদি সত্য হতো তবে তিনি এখানে জনগণের ভালোবাসা পেলেন কী করে? লেখক কামারুজ্জামান: মুহাম্মদ কামারুজ্জামান দেশী বিদেশী বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কলাম লিখতেন। পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন জার্নালে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তার লিখিত বইগুলো পাঠক সমাদৃত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আধুনিক যুগে ইসলামী বিপ্লব, পশ্চিমা চ্যালেঞ্জ ও ইসলাম, বিশ্ব পরিস্থিতি ও ইসলামী আন্দোলন, সংগ্রামী জননেতা অধ্যাপক গোলাম আযম, সাঈদ বদিউজ্জামান নুরসী ইত্যাদি। বিচারিক কার্যক্রম: ২০১৩ সালের ৯ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারক মো. শাহিনুর ইসলাম মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদন্ডের রায় দেয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৬ জুন আপিল করেন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। গত বছরের ৫ জুন এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের পক্ষে আপিলের যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন তার আইনজীবীরা। এরপর ৩ নবেম্বর আপিল বিভাগের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ও বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার বিচারপতির বেঞ্চ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে সংক্ষিপ্ত আদেশে রায় ঘোষণা করেন। যে কারনে মৃত্যুদন্ডাশের বিরোধীতা করলেন এক বিচারপতি: আপিলের রায়ে জ্যোষ্ঠ বিচারপতি মো.আবদুল ওয়াহহাব মিঞা রায়ে বলেন, আপিল আংশিকভাবে মঞ্জুর হলো। ২, ৪ এবং ৭ নম্বর অভিযোগে আপিলকারী দোষী না হওয়ায় (মুহাম্মদ কামারুজ্জামান) খালাস দেয়া হলো। ৪ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যৃদন্ডের স্থলে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হলো। ২ নম্বর অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণে ব্যর্থ। কারণ দোষী প্রমাণিত না হওয়ায় অভিযুক্তকে খালাস দেয়া হলো। ৩ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদন্ডের আদেশ সংশোধন করে যাবজ্জীবন সাজা দেয়াই যুক্তিযুক্ত। কারণ ঘটনাস্থলে অভিযুক্তের উপস্থিতি নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, এটা অনিশ্চিত। ৪ নম্বর অভিযোগের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে,প্রসিকিউশন অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। ৭ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, এই অভিযোগটিও প্রসিকিউশন সন্দেহাতীত প্রমাণ করতে পারেনি। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন ‘কামারুজ্জামান কোনো কোনো দিন সকালে, কোনো কোনো দিন দুপুরে আবার কোনো কোনো দিন সন্ধ্যার পর ডাক বাংলোর ক্যাম্পে আসতো। যদি তাই হয় তাহলে কিভাবে অভিযুক্ত প্রণিধানযোগ্য আল বদর নেতা হলেন? কিভাবে সাক্ষীরা তাকে দেখেছে এবং ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা রয়েছে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এ বিষয়গুলো আরো বিস্তারিত ট্রাইব্যুনাল বিবেচনা নিতে পারতো। তাই অভিযুক্তকে খালাস দেয়া হলো। প্রাণভিক্ষা নাটক: সরকার কামারুজ্জামান, তার পরিবার ও ইসলামী আন্দোলনকে অপদস্ত করার জন্য গুজব ছড়ায় যে, কামারুজ্জামান প্রাণভিক্ষার জন্য আবেদন করেছেন। দুইজন মেজিস্ট্রেটের কাছে তিনি এই কথা বলেছেন। এরপর মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের সাথে ১১ এপ্রিল শনিবার বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে পরিবারের সদস্যরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাক্ষাত করেন। সাক্ষাৎ শেষে তার ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামী বলেন, প্রাণভিক্ষা চাওয়া প্রসঙ্গে বাবা বলেছেন, প্রাণের মালিক আল্লাহ। রাষ্ট্রপতি জীবন দেয়ারও মালিক নন নেয়ারও মালিক নন যে তার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবো। তিনি বলেন, বাবা বিচলিত নন, আমরা হাসিমুখে বিদায় দিয়ে গেলাম। তার সাথে কোন ম্যাজিস্ট্রেট দেখা করেননি বলেও জানান মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। বড় ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামী বলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চওয়ার প্রশ্নই উঠে না। ক্ষমা চাইবেনতো শুধু আল্লাহর কাছে। তিনি বলেন, আমার বাবার স্বপ্ন ছিল এদেশে ইসলামী শাসন কায়েম হবে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বেই এদেশে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।তিনি বলেন, তার বাবা বলেছেন, তার সাথে বিচারের নামে প্রহসন করা হয়েছে। ১৯ বছরের একজন কিশোরকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে। এর বিচারের ভার তিনি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাবার মনোবল দৃঢ় আছে। তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। বাবা বিচলিত নন, আমরা হাসিমুখে বিদায় দিয়ে গেলাম। জীবনের শেষ মুনাজাত: ১১ এপ্রিল পরিবারের সদস্যরা শেষ দেখা করতে গেলে তাদের নিয়ে জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামান কেন্ত্রীয় কারাগারে মোনাজাত করেন বলে তাকে দেখা করতে যাওয়া ২১ জন সদস্যের একজন প্রকাশ করেন। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, “আলহামদুলিল্লাহ। কাঁদতে কাঁদতে গিয়েছিলাম, হাসি মুখেই বিদায় জানিয়ে আসলাম প্রিয়জন প্রিয় নেতাকে। আমার দু চোখ, আমার হৃদয় সৌভাগ্যবান। আমি তাকে কাঁদতে দেখিনি বরং আমাদেরকেই সান্ত্বনা দিয়েছেন। উনি যখন বিদায় বেলায় আমাদেরকে নিয়ে মোনাজাত করছিলেন বলছিলেন, হে আল্লাহ আমি দেশের জন্য কাজ করেছি ইসলামের জন্য কাজ করেছি যারা এই অন্যায় বিচার করলেন, এই বিচারে সহযোগিতা করেছে এদের বিচার আপনি দুনিয়াতে এবং আখিরাতে উভয় জায়গায় করবেন। আমি আমার দুই হাত দিয়ে কোন অন্য কাজ করিনি আমার মুখ দিয়ে কাওকে গালি দেইনি আমার সম্পর্কে আপনি ভালো জানেন। আপনি আমাকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করুন। আমার পরিবার, স্বজনসহ সকলকে ধৈর্য ধারাণ করার তৌফিক দিন। মুনাজাত শেষে উনি শেরপুরসহ দেশবাসী এবং বিশ্ববাসীকে সালাম জানিয়েছেন। সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন।” অনন্তকালের যাত্রা: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী আদেশে মৃত্যুদন্ড কার্যকরের নামে জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বিশিষ্ট সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল রাত রাত ১০টা ৩০ মিনিটে হত্যা করা হয়। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন। চির নিন্দ্রায় শায়িত শহীদ কামারুজ্জামান: শেরপুরে নিজের গড়া এতিমখানার পাশে চিরনিন্দ্রায় শায়িত হলেন শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। দাফনের পর থেকেই কবর জিয়ারতের জন্য নামে মানুষের ঢল। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে গতকাল রোববার ভোরে শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জমানকে দাফনের পর বেলা বাড়ার সাথে সাথেই হাজার হাজার মানুষ তার কবর জিয়ারত করতে আসছেন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা লোকজন কামারুজ্জামানের রূহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করছেন। এ সময় অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার নিজের গড়া শেরপুর সদর উপজেলার কুমরী বাজিতখিলা এতিমখানার পাশেই তার লাশ দাফন করা হয়। গতকাল রোববার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে রোববার ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে এতিমখানা মাঠে তার নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কামারুজ্জামানের আত্মীয়সহ স্থানীয়রা অংশগ্রহণ করেন। আশেপাশে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়ির কারণে তারা অংশগ্রহণ করতে পারেনি। দাফনস্থলে গণমাধ্যম কর্মীসহ স্থানীয় এলাকাবাসীর প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ছিল। সারারাত প্রচুর ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তার গ্রামের বাড়ির পাঁচ বর্গ কিলোমিটারের বাইরে হাজার হাজার মানুষ রাতভর অপেক্ষা করেও জানাযায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাননি। এমনকি ঢাকা থেকে লাশের সাথে যাওয়া গণমাধ্যম কর্মীরাও স্থানীয় বাজিতখিলা বাজারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকেছিলেন। রাতে ওই এলাকায় প্রচুর ঝড়-বৃষ্টি হয়। পুরো এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। ভোর ৪টার দিকে বিদ্যুৎ আসলেও থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল। তারপরও জনসমাগম কমেনি। নিকটাত্মীয় ও কিছু গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে নামাযে জানাযার পর ৫টা ৪০ মিনিটে উপস্থিত হাজার হাজার জনতার গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও বাধা দেয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। মাঠের পূর্ব অংশের অর্ধেক লোক জানাযায় শরীক হতে পারেনি। মাঝখানে ব্যারিকেড দেয়াছিল। এ সময় জনতা নারায়ে তাকবীর শ্লোগানে আকাশ বাতাশ মুখরিত করে তোলে। জাতীয় মসজিদে গায়েবানা জানাযা: ১২ এপ্রিল বাদ যোহর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে জামায়াতের সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ডা. রেদওয়ানউল্লাহ শাহেদী, ঢাকা মহানগরী মজলিসে শূরা সদস্য ও মতিঝিল থানা আমীর কামাল হোসেনসহ হাজার হাজার নেতাকর্মী ও মুসল্লি এতে উপস্থিত ছিলেন। শহীদ কামারুজ্জামানের জন্য দোয়া করার উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সৌদি আরবের জেদ্দা, তুরস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা, পর্তুগালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গায়েবানা নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। ১১ এপ্রিল ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান রহ.-কে খুন করে যে আন্দোলনকে নিভিয়ে দিয়ে চেয়েছিল সে আন্দোলনকে নেভানোর সাধ্য তাদের নেই। আল্লাহ তাঁর নূরকে প্রজ্জলিত করবেন, এটা আল্লাহর ওয়াদা। মহান রাব্বুল আলামীন শহীদ কামারুজ্জামান ভাইকে কবুল করুন। তাঁকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত করুন। আমিন।

শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা

শহীদ প্রোফাইল

আব্দুল কাদের মোল্লা

মিথ্যার দেয়াল তুলে ধ্রুব সত্যকে কখনো আড়াল করা যায় না। সত্য উদ্ভাসিত হয় তার নিজস্ব আলোয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ফাঁসী দেয়া হয় জামায়াতে ইসলামীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল সাংবাদিক নেতা শিক্ষাবিদ আব্দুল কাদের মোল্লাকে। সরকার যুদ্ধাপরাধী সাজিয়ে ফাঁসী দিলেও শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা আজ স্মরণীয় শত কোটি প্রাণে; ইসলামের জন্য জীবন উৎসর্গকারী এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি সত্যপ্রেমীদের হৃদয় থেকে কখনো মুছে যাবেন না, আলোর পথের যাত্রীদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন যুগ যুগ ধরে। ১৯৪৮ সালের ২রা ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলাস্থ সদরপুর উপজেলার চরবিষ্ণুপুর ইউনিয়নের ডাঙ্গী গ্রামে নিজ মাতুলালয়ে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সানাউল্লাহ মোল্লা ও মাতার নাম বাহেরুন্নেসা বেগম। আব্দুল কাদের মোল্লা ছিলেন নয় ভাইবোনের মাঝে ৪র্থ। তার জন্মের কিছুকাল পরে তার পিতা-মাতা সদরপুরেরই আমিরাবাদ গ্রামে এসে বাড়ি করে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। প্রাথমিক শিক্ষাঃ তিনি মেধাবী একজন ছাত্র হিসেবে ১৯৫৯ ও ১৯৬১ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে আমিরাবাদ ফজলুল হক ইনিষ্টিটিউট থেকে প্রথম শ্রেণীতে মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতকার্য হন। ফরিদপুরের বিখ্যাত রাজেন্দ্র কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে ১৯৬৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরিক্ষায় উত্তীর্ন হন। ১৯৬৮ সালে তিনি একই কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করেন। কিন্তু প্রবল আর্থিক সংকটের কারনে এরপর তাকে শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করতে হয়। পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া হয়নি তখন আর। ফরিদপুরের শিব সুন্দরী (এস এস) একাডেমি নামক একটি স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন কিছু কাল। উচ্চশিক্ষাঃ ১৯৬৯ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে এমএসসি করার জন্যে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ণকালে তিনি ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।মুক্তিযুদ্ধের কারনে ১৯৭১ সালে তিনি মাস্টার্স পরীক্ষা না হওয়ায় তিনি বাড়ি চলে যান। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭২ এর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। যুদ্ধের সময় প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আরো অনেকের মত আবদুল কাদের মোল্লার লেখাপড়াতেও ছন্দ পতন ঘটে। ১৯৭৪ সালে তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর (ইন্সিটিউট অব এডুকেশনাল রিসার্চ) বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭৫ সালে তিনি শিক্ষা প্রশাসনের ডিপ্লোমায় অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরে আবার ১৯৭৭ সালে শিক্ষা প্রশাসন থেকে মাস্টার্স ডিগ্রীতে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম হন। কর্মজীবনঃ আব্দুল কাদের মোল্লা ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঢাকার বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। এমএড পরীক্ষার রেজাল্টের পরে তিনি বাংলাদেশ রাইফেলস পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন এবং পরে তিনি একই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এ সংস্কৃতি কর্মকর্তা হিসাবে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে রিসার্চ স্কলার হিসাবে বাংলাদেশ ইসলামী সেন্টারে যোগ দেন। গৌরব-সাফল্যের ধারাবহিকতায় উদয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, রাইফেল পাবলিক স্কুল এবং মানারাত স্কুলের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৮১ সালে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকায় সাব-এডিটর পদে যোগদান করেন তিনি। শিক্ষকতা পেশায় যে সত্যের পরশ পেয়েছিলেন, তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে তিনি সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এ সময়ে তাঁর ক্ষুরধার ও বস্তুনিষ্ঠ লেখা প্রকাশ হতে থাকে দেশের জাতীয় দৈনিকসমূহে। বীক্ষণ ছদ্মনামে তার লেখা আর্টিকেল গুলো সচেতন পাঠক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে। বৈবাহিক জীবনঃ জনাব মোল্লা দিনাজপুর নিবাসী বেগম সানোয়ার জাহানের সাথে ১৯৭৭ সালের ৮ অক্টোবর তারিখে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বেগম সানোয়ার জাহান ইডেন কলেজ থেকে পড়াশুনা করেছেন। তিনিও শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার মত বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন ও ইডেন কলেজের ছাত্রী ইউনিয়নের জিএস ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বেগম সানোয়ার জাহান তার বাবার সাথে কুষ্টিয়াতে ছিলেন ও সক্রিয় ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছিলেন। বেগম সানোয়ার জাহানদের বাসা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খাবার যেত। দুই পুত্র ও চার কন্যার সুখী সংসার তাদের। সব সন্তানই দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করেছেন। পরিবারের সকলেই ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত। বেগম সানোয়ার জাহান জামায়াতের রুকন ও দায়িত্বশীলা। সাংবাদিক কাদের মোল্লাঃ সেসময়েরই একজন নির্ভীক সাংবাদিক শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা। বর্ণাঢ্য জীবন নাটকের শেষ দৃশ্যে তিনি আমাদের কাছে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত হলেও জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জল সময়টা অতিবাহিত করেছেন একজন নির্ভীক সাংবাদিক হিসেবে। সামরিক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে যে প্রত্রিকাগুলো তখন গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে সর্বমহলের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছিল তাদের মধ্যে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আর এ পত্রিকাটিতে দক্ষ হাতে দায়িত্ব পালনের ফলে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য মনোনীত হন। সাংবাদিকতা ও লেখালেখির পাশাপাশি জড়িয়ে পড়েন সাংবাদিকদের দাবী আদায়ের সংগ্রামে। ফলে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য মনোনীত হন। সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৮২ ও ১৯৮৪ সালে পরপর দু’বার তিনি ঐক্যবদ্ধ ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অন্তরে দ্রোহ আর বিপ্লবের চেতনা লালন করেও সদা হাস্যোজ্জল এ মানুষটি ছিলেন সাংবাদিক আড্ডার প্রাণ-ভ্রমরা। তার রসময় গল্পকথার সজীবতায় ভরে উঠতো গনমানুষের চেতনার প্রতীক জাতীয় প্রেসক্লাব। কিন্তু একজন সাংবাদিকের জীবন সাধারণভাবেই কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। কখনো সমাজের বিপথগামী অংশ, কখনো কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল, আবার কখনওবা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির রোষানলে পড়তে হয় তাকে। সত্য-মিথ্যার চিরন্তন দন্দ্বে উৎসর্গিত হয় সাংবাদিকের জীবন। চারপাশের চেনাজন, পরিচিত বন্ধুমহল একসময়ে পরিণত হয় তার শত্রুতে। হানে প্রাণঘাতি ছোবল। যে ছোবলের রূপ হয় নানারকম। মানসিক যন্ত্রণায় বিপন্নতা, শারিরিক আঘাতে পঙ্গুত্ববরণ, প্রাণঘাতি হামলায় মৃত্যু, কারাবন্দিত্বের নিঃসঙ্গ যাতনা কিংবা প্রহসনের বিচারে জীবনাবসান। এসবই ছিল যুগে যুগে সাংবাদিক জীবনের অনিবার্য উপাদান। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার জীবনেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় একসময় সাংবাদিকতার পেশাকে বিদায় জানাতে হয় তাঁকে। কিন্তু যে পেশা তার জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে এর মহত্বকে তিনি ধারণ করতেন সবসময়। তাইতো তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবে ছিলেন সাংবাদিক সমাজের অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে। দৈনিক সংগ্রাম অফিসের প্রতিটি ধুলিকণা এখনো বহন করে বেড়াচ্ছে কাদের মোল্লার স্মৃতি। রাজনৈতিক জীবনঃ শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার রয়েছে সংগ্রামী রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যায়ন কালেই তিনি কম্যূনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি এ সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকার পর তাফহীমুল কুরআনের হৃদয়স্পর্শী ছোঁয়ায় তিনি ইসলামের প্রতি প্রবল আকর্ষিত হন এবং আলোকিত জীবনের সন্ধান পেয়ে ছাত্র ইউনিয়ন ছেড়ে তিনি ছাত্রসংঘের তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান শাখায় যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে তিনি এ সংগঠনের সদস্য হন। ছাত্রসংঘের শহিদুল্লাহ হল শাখার সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি, ঢাকা মহানগরীর সেক্রেটারী ও একই সাথে কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালের মে মাসে জামায়াতের রুকন হন। তিনি অধ্যাপক গোলাম আযমের ব্যাক্তিগত সেক্রেটারি এবং ঢাকা মহানগরীর শূরা সদস্য ও কর্মপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে অল্পদিনের ব্যাবধানেই জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশ-এ-শূরার সদস্য হন। ১৯৮২ সালে তিনি ঢাকা মহানগরী জামায়াতের সেক্রেটারী ও পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের প্রথম দিকে ঢাকা মহানগরীর নায়েব-এ-আমীর, অতঃপর ১৯৮৭ সালে ভারপ্রাপ্ত আমীর এবং ১৯৮৮ সালের শেষ ভাগে তিনি ঢাকা মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন যা বাতিলের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাড়ায়। ১৯৯১ সালের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তিনি জামায়াতের প্রধান নির্বাচনী মুখপাত্র হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯১ সালে কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ২০০০ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে মনোনীত হন। তিনি ২০০৪ সালের মার্চ মাসে স্বল্প সময়ের জন্য ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। উক্ত দায়িত্বের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী আন্দোলনে তিনি চারদলীয় জোটের লিয়াজো কমিটির গুরুত্বপূর্ন সদস্য হিসাবে নিয়োজিত ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশর প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা। বিশেষ করে ৯০এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি জামায়াতের প্রতিনিধি হিসেবে লিয়াঁজো কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। তখন কমিটিতে গৃহীত আন্দোলনের কর্মসূচি সম্পর্কে ব্রিফিং করতেন আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিম এবং তা বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপানোর ব্যবস্থা করতেন শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা। লিয়াঁজো কমিটিতে বিভিন্ন সময়ে নানা দায়িত্ব পালন করার কারনে বিএনপি দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা সহ উভয় দলের সিনিয়র নেত্রীবৃন্দের সাথে আন্দোলনের নীতি নির্ধারণী সভাতে মিলিত হতেন তিনি। জনাব মোল্লাকে বিভিন্ন মেয়াদে চার চারবার জেলে যেতে হয়। আইয়ুব সরকারের নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের দায়ে ১৯৬৪ সালে প্রথম বারের মত তিনি বাম রাজনীতিক হিসেবে গ্রেপ্তার হন। ১৯৭১ সালে তিনি আবার গ্রেপ্তার হন। কিন্তু স্থানীয় জনতার বিক্ষোভের মুখে পুলিশ তাকে স্থানীয় পুলিশ স্টেশন কাস্টোডী থেকেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। জেনারেল এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কারনে আব্দুল কাদের মোল্লাকে আবারও আটক করে রাখা হয় ১৯৮৫ সালের ২২শে এপ্রিল থেকে ১৪ই অগাস্ট। প্রায় চারমাস আটক থাকার পরে উচ্চ আদালত তার এ আটকাদেশকে অবৈধ ঘোষণা করলে তিনি মুক্ত হন। এরপর ১৯৯৬ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী তত্তাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদের সাথে একই দিনে গ্রেফতার হন। সাত দিন পরে তিনি মুক্ত হন। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার কূটনীতিকদের সাথে ছিল গভীর সম্পর্ক। সদা হাস্যোজ্জল ও রসময় কাদের মোল্লার কথা ছাড়া কোন প্রোগ্রাম জমজমাট হতো না। জামায়াতের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি নানা কূটনীতিক প্রোগ্রামে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। জনাব মোল্লা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমন করেছেন। তিনি আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, ভারত সহ নানা দেশ সফর করেছেন। জনাব মোল্লা সক্রিয় ভাবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংস্থার সাথে যুক্ত ছিলেন। যার মধ্যে বাদশাহ ফয়সাল ইন্সটিটিউট, ইসলামিক এডুকেশন সোসাইটি ও এর স্কুল, সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী রিসার্চ একাডেমী, সদরপুর মাদরাসা ও এতিমখানা, ফরিদপুর জেলার হাজিডাঙ্গি খাদেমুল ইসলাম মাদরাসা ও এতিমখানা, সদরপুর আল-আমিন অন্যতম। এছাড়াও তিনি ঢাকার গুলশানের মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি ছিলেন। জনাব মোল্লা দেশ বিদেশের সমসাময়িক বিষয়ের উপর একাধিক কলাম ও প্রবন্ধ লিখেছেন। দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংগ্রাম, পালাবদল, মাসিক পৃথিবী, কলম ইত্যাদি নানা জায়গায় তার লেখা ছাপা হয়েছে। প্রত্যাশিত শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে দেশে বিদেশে তিনি বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়ামে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের উপরে তার গুরুত্বপূর্ণ লেখা পাওয়া যায়। তার লেখা কলাম ও প্রবন্ধ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া ও বস্তুবাদ ও কম্যূনিজমের উপরে তার বৈজ্ঞানিক সমালোচনা শিক্ষিত মহলের কাছে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় তিনি প্রথমে আব্দুল কাদের নামে লেখা শুরু করেন।পরবর্তীতে তিনি বীক্ষণ ছদ্মনামে লেখা শুরু করেন ও উনার লেখা গুলো খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনীতি, সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, সমসাময়িক সমস্যা ইত্যাদি নানা বিষয়ে তার লেখা মানুষের চিন্তা-চেতনার জগতে ঢেউ তুলতে শুরু করে। জনাব মোল্লা নিয়মিত কুরআন পড়তে ও কুরআন তেলাওয়াত শুনতে পছন্দ করতেন। তিনি সাংগঠনিক ব্যস্ত সময় মধ্যেও তিনি বিভিন্ন বিখ্যাত লেখক, কবি যেমন আল্লামা ইকবাল, সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদী, সাইয়্যেদ কুতুব ইত্যাদি নানা লোকের লেখা পড়তে পছন্দ করতেন। ২০১০ সালের ১৩ জুলাই সরকার তাকে রাজনৈতিক মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে এবং পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করে। ট্রাইবুনালের রায়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হয়। এরপর সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় শাহবাগে স্থাপিত গণজাগরণ মঞ্চের দাবি অনুযায়ী সরকার আইন সংশোধন করে আপিল দায়ের করে। সংশোধিত আইনের ভিত্তিতে তাকে ফাঁসির আদেশ প্রদান করা হয়। আবদুল কাদের মোল্লা ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ পাননি। এমনকি রিভিউ আবেদন খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পূর্বেই তড়িঘড়ি করে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১ মিনিটে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তাঁকে ফাসি দেয়ার প্রায় দেড় বছর পর তার রিভিউ আবেদন খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি বিচারের নামে কত বড় প্রহসনের শিকার হয়েছেন!

শহীদ মীর কাসেম আলী

শহীদ প্রোফাইল

মীর কাসেম আলী

জননেতা মীর কাসেম আলী মিন্টু ক্ষণজন্মা একজন প্রতিভাবান উজ্জল নক্ষত্র হিসেবে পরিচিত। যিনি এদেশের ছাত্র জনতার প্রিয় কাফেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রীয় সভাপতি, প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, সংগঠক, শিল্প উদ্যোক্তা, সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা, জনকল্যাণ ও সমাজকল্যাণ মূলক অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই সকলের নিকট পরিচিত ও সমাদৃত। আমরা হাদিস থেকে জানি ৭ শ্রেণির লোকদেরকে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন আরশের ছায়াতলে স্থান দেবেন। এরমধ্যে একশ্রেণির লোক হলো সৎ ব্যবসায়ী। আমাদের দেশে বড় ব্যবসায়ী মানেই লুটেরা। এই লুটেরা সাম্রাজ্যের মধ্যেই সৎ ব্যবসায়ীর নজির স্থাপন করেছেন শহীদ মীর কাসেম আলী রহ.। শহীদ মীর কাসেম আলী যেন আরশের ছায়াতলে স্থান পাওয়া ব্যবসায়ীদের প্রতিচ্ছবি। জনাব মীর কাসেম আলী প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকে মেধা, যোগ্যতা দিয়ে সাধ্যমতো সাজানোর কারিগর হিসেবে ও নিরলসভাবে কাজ করে গিয়েছেন। তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদই নন, দেশে-বিদেশে তিনি একজন উদ্যোক্তা, সফল ব্যবসায়ী হিসেবে সুপরিচিত। বিশেষ করে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি একটি সপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে দিন রাত পরিশ্রম করেছিলেন। জাহেলিয়্যাতের মোকাবিলায় ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের চেষ্টায় নিজেকে করেছিলেন আত্মনিয়োগ। যেখানেই হাত দিয়েছেন, সোনা ফলেছে। সাহিত্য-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ব্যবসা, পর্যটন শিল্প, আবাসন খাত, কৃষি, মিডিয়া সব ক্ষেত্রেই তিনি ভূমিকা রেখেছেন স্বমহিমায় ও উজ্জ্বলতার সাথে। তিনি দেখিয়েছেন অমানবিক পুঁজিবাদী সমাজের বিপরীতে ইসলামের অপার সৌন্দর্য। কেউ বক্তব্য দেয়, কেউ থিউরি দেয়, কেউ আবার সেই থিউরি কপচায়, কেউ বলে এই করা দরকার, সেই করা দরকার, কেউ উপদেশ দেয়, কেউ আবার সেই উপদেশের ক্রিটিসিজম করে, কেউ সমালোচনা করে, কেউ সেই সমালোচনার সমালোচনা করে বিতর্কের হাট বসায়। মীর কাসেম আলী এসবের লোক নন। তিনি নীরবে কাজ করে যেতেন। যারা কাজ করেন তাদের উৎসাহ দিতেন। তিনি বলার চাইতে করতেন বেশী। জনশক্তিদের উপদেশ দিয়ে শেখানোর চাইতে কাজ করে উদাহরণ হওয়া ছিল তার পছন্দের। জন্ম ও শিক্ষা অসংখ্য গুণের অধিকারী এই ক্ষণজন্মা ব্যক্তি ১৯৫২ সালের ৩১ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ জেলার, হরিরামপুর থানার, সূতালরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৃত মীর তৈয়ব আলী ও মাতা মৃত রাবেয়া আখতার (ডলি বেগম)। পারিবারিকভাবে আদর করে তাঁকে পেয়ারু নামে ডাকতেন। ৪ ভাই ১ বোন। জনাব মীর কাসেম আলীর বাবা সরকারী চাকুরী করতেন বিধায় বরিশাল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার হাতে খড়ি তাঁর। মীর কাশেম আলী প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত বরিশালে অবস্থিত আদর্শ বিদ্যালয়ে ১৯৫৮-১৯৬২ সাল পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। ১৯৬৩-১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ফরিদপুর জেলা স্কুলে লেখাপড়া করে ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে লেখাপড়া করে ১৯৬৭ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৬৭-১৯৬৮ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে লেখাপড়া করে ১৯৬৯ সালে এইচএসসি পাস করেন। অতঃপর তিনি চট্টগ্রাম কলেজে ১৯৬৯-১৯৭০ শিক্ষাবর্ষে বিএসসি অনার্স প্রথম বর্ষে পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ে ভর্তি হয়ে অধ্যয়নরত ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি চট্টগ্রাম কলেজের পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্স প্রথম বর্ষের লেখাপড়া স্থগিত করেন। অতঃপর ১৯৭১-১৯৭২ শিক্ষাবর্ষের বিএ পাস কোর্সে সাবেক আদর্শ কলেজ বর্তমানে আইডিয়াল কলেজ, ৬৫ সেন্ট্রাল রোড ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে অধ্যয়ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৭৩ সালের বিএ (পাশ) পরীক্ষা (১৯৭৪ সালে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়)। উক্ত পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৪ সালের এমএ প্রিলিমিনারি পরীক্ষা মে-জুন ১৯৭৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগে এবং ১৯৭৫ সালে এমএ ফাইনাল পরীক্ষা (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর/১৯৭৭ সালে অনুষ্ঠিত হয়)। উক্ত পরীক্ষায় অর্থনীতিতে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। সাংগঠনিক জীবন মানবতার কল্যাণে জীবন ব্যায়িত মীর কাসেম আলী ছাত্রদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ছিলেন প্রথম কাতারে। ১৯৬৬ সালে যোগদান করেন মেধাবীদের প্রিয় সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘে। ১৯৭১ সালের নভেম্বরে প্রাদেশিক জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ সালে ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠাতাদের তিনি একজন ছিলেন। দায়িত্ব পালন করেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রীয় সভাপতির। ১৯৭৯ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। এরপর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা, কর্মপরিষদ ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পারিবারিক জীবন শহীদ মীর কাসেম আলী ১৯৭৯ সালে খন্দকার আয়েশা খাতুনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ২ ছেলে, ৩ মেয়ে। প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত। রাজনৈতিক আন্দোলন শহীদ মীর কাসেম আলী ১৯৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯৪ সালের কেয়ারটেকার আন্দোলন, ১৯৯৮ সালের দেশবিরোধী পার্বত্য কালো চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন। সামাজিক আন্দোলন ও কর্মজীবন শিক্ষাজীবন শেষে ও ছাত্রশিবির থেকে বিদায় নিয়ে শহীদ মীর কাসেম আলী দায়িত্ব নিলেন রাবেতা আলম আল ইসলামী (মুসলিম বিশ্বে ভ্রাতৃত্ব) নামক একটি এনজিওতে যার অন্যতম কাজ স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ করে যেখানে মুসলমানরা নির্যাতিত। তখন সাল ছিল ১৯৭৯। বাংলাদেশে আগত বার্মার নির্যাতিত মুসলমান শরণার্থীদের জন্য আশ্রয়, খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান। কক্সবাজারের মরিচ্যাপালংএ গড়ে তুললেন রাবেতা হাসপাতাল। তার বড় ভাইসহ একদল সদ্যপাশ করা তরুন ডাক্তার আর নিবেদিত প্রাণ একঝাঁক যুবকদের নিয়ে গড়ে তুলেন এই প্রকল্প। সেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, কয়েকটি চেয়ার টেবিল দিয়ে শুরু। দেখতে দেখতে সেই হাসপাতালের বড় হলো, অনেক বড়। গড়ে উঠলো ডায়াগনস্টিক সেন্টার, অপারেশন থিয়েটার (O.T), ফার্মেসী, ইনডোর- আউটডোর সার্ভিসসহ সার্বক্ষনিক ব্যবস্থাপনায় এক পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। স্থানীয় বাংলাদেশীদের চিকিৎসাও চললো পাশাপাশি। গড়ে উঠলো নিজস্ব বিল্ডিং, চালু হলো নার্সিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, তৈরি হল আবাসিক হোস্টেল। গ্রাম-বাংলার জনগন এর চাহিদাকে সামনে রেখে প্রবর্তন করা হলো ‘পল্লী চিকিৎসক প্রকল্প’। এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুবকরা ছড়িয়ে পড়লো গোটা বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এরপর শুরু হলো ইমামদের স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ, যার প্রধান অংশে রয়েছে স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের প্রশিক্ষণ। এভাবেই মীর কাসেম আলীর মাধ্যমে সারা বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। মীর কাসেম এদেশের জনগণের উন্নতির জন্য যে চিন্তাভাবনা করেছেন তার বাস্তবরূপ প্রকাশ পেয়েছে রাঙ্গামাটির পিছিয়ে পড়া পার্বত্য জনগন এর জন্য নির্মিত রাবেতা হাসপাতাল, মাইনিমুখ এর মাধ্যমে। এছাড়াও রয়েছে রাবেতা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স টেকনাফ এর উখিয়া ও হিলি, রংপুর এর মিঠাপুকুর সহ বিভিন্ন ছোটখাট স্বাস্থ্য প্রকল্পের মাধ্যমে। দিন রাত পড়ে থাকতেন আটকে পড়া রোহিঙ্গা, বিহারী, সাঁওতাল, চাকমা, মারমাসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের সেবায়। ঢাকায় আটকে পড়া বিহারীদের জন্য তৈরী করেছেন মুহাম্মদপুরে রাবেতা হাসপাতাল। দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ইবনে সিনাকে একটি ছোট্ট স্বাস্থ্য পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে বিরাট হাসপাতাল, ডি ল্যাব, ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রি, ইমেজিং সেন্টার এবং ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ স্থাপন পর্যায়ে নিয়ে আসেন। এছাড়া ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনে থাকাকালীন তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল কাকরাইল, শাহজাহানপুর, বরিশাল, খুলনা, রংপুর এবং কমিউনিটি হাসপাতাল নামে মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় গড়ে তুলেন হাসপাতাল। রাজশাহীতে ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ও মেডিকেল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট মীর কাসেম আলীর একনিষ্ঠ শ্রমের ফসল। আর ফুয়াদ আল খাতিব হাসপাতাল ঢাকা ও কক্সবাজারে এক অতিপরিচিত নাম। পেশাগত জীবন শহীদ মীর কাসেম আলী বিভিন্ন ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিলেন। উল্লেখযোগ্য হলো, মীর কাসেম আলী ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান ও পরিচালক ছিলেন। তিনি দিগন্ত মিডিয়া গ্রুপেরও চেয়ারম্যান ছিলেন যেটি দৈনিক নয়া দিগন্ত এবং দিগন্ত টেলিভিশন পরিচালনা করে। এছাড়াও তিনি ইবনে সিনা ট্রাস্ট এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি সৌদি আরবে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম বিশ্বের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও দাতব্য সংগঠন ‘রাবেতা আল-আলম আল ইসলামী’ এর এদেশীয় পরিচালক ছিলেন। এসবের বাইরে তিনি ইন্ড্রাস্টিয়ালিস্ট অ্যান্ড বিজনেসম্যান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, কেয়ারি লিমিটেড, ফুয়াদ আল খতিব, আল্লামা ইকবাল সংসদ, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম, দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটি, সেন্টার ফর স্ট্রেটেজি ও পিস স্টাডিস সহ দেশে-বিদেশে মোট ৪০টি প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। শাহদাত ২০১২ সালের ১৭ জুন তাঁকে কথিত মানবতা বিরোধী মামলায় এরেস্ট করা হয়। এরপর সাজানো ও হাস্যকার বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁকে ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে খুন করা হন। তাঁর শাহদাতের কয়েক সপ্তাহ আগে ৯ আগস্ট তাঁর আইনজীবী ও ছেলে ব্যারিস্টার আরমানকে হাসিনা সরকার তুলে নিয়ে যায়। আইনী প্রক্রিয়ায় পরাজিত হাসিনা সরকার বিচারকদের চাপ দিয়ে জোর করে ফাঁসীর করে ব্যবস্থা করে। মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যরিস্টার আরমানকে আজ পর্যন্ত গুম করে রেখেছে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার। ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর শহীদের জানাজায় যাওয়ার সময় ব্যাপক হয়রানি করে মীর কাসেম আলীর পরিবারকে। মানিকগঞ্জের নিজ গ্রামে শহীদ মীর কাসেম আলী শায়িত আছে। মহান রাব্বুল আলামীর তাঁকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত করুন।

শহীদ আবদুল খালেক মন্ডল

শহীদ প্রোফাইল

আবদুল খালেক মন্ডল

মাওলানা আব্দুল খালেক মন্ডল বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সদস্য- ২০০১ জন্ম ও পারবারিক জীবন: জনাব মাওলানা আব্দুল খালেক মন্ডল ১৯৪৪ সালের ১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম মোঃ লুৎফর রহমান এবং মাতার নাম মরহুমা দেলজান বিবি। তিন পুত্র ও পাঁচ কন্যার জনক। শিক্ষা ও কর্মজীবন: তিনি দাখিল, আলেম ও ফাজিল পরীক্ষায় ১ম শ্রেণীতে ১ম স্থান অধিকার করেন। তিনি ১৯৬৫ সালে মাদ্রাসা শিক্ষায় কামিল ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকে ২য় শ্রেণীতে ৬ষ্ঠ ও পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ-এতে ১ম শ্রেণীতে ২য় স্থান লাভ করেন। তিনি পেশায় একজন শিক্ষক রাজনৈতিক জীবন: জনাব মাওলানা আব্দুল খালেক মন্ডল জামায়াতে ইসলামীর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ রাজনীতি শুরু করেন। তিনি বিভিন্ন ইউনিয়ন, থানা ও জেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৮৭ সালে ইউনিয়ন পরিষদ ও ১৯৯০ সালে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি জেলা জামায়াতের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও কেন্দ্রীয় শূরার সদস্য। তিনি ১৯৮৭ সাল হতে ২০০০ সাল পর্যন্ত স্থানীয় সরকার উন্নয়নের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। পরে মাওলানা আব্দুল খালেক মন্ডল বাংলাদেশ জামায়াতী ইসলামীর পক্ষ হতে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি স্থানীয় আর্থ-সামাজিক উন্নয়নমূলক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন একজন বলিষ্ঠ জননেতা হিসেবে। যার পরিপ্রেক্ষিতে জনগণ তাঁর প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে তাঁকে বাংলাদেশের একজন জনপ্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তি হিসেবে নির্বাচিত করেন। তিনি ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় জনপ্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে প্রথমবারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। শাহদাত: ২০১৫ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এর পর ২০১৮ সালের ৫ মার্চ তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। ২০২২ সালের ২৪ মার্চ তাকে ফাঁশিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু দন্ডের আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। সেই থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি জেলখানাতেই ছিলেন। ২০ জুলাই বৃহষ্পতিবার সন্ধা ৬টার দিকে খুলনার আড়াইশ বেড হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। জানাজা: লাখো মানুষের অংশগ্রহণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সাবেক সদস্য, সাতক্ষীরা জেলার সাবেক আমীর ও সাতক্ষীরা-২ আসনের সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন, সমাজসেবক, প্রবীণ জননেতা অধ্যক্ষ মাওলানা আবদুল খালেক মন্ডল এর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। জানাজায় অংশ নিতে শাকরা ফুটবল মাঠে সাধারণ মানুষের ঢল নামে। শুক্রুবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে জানাযা নামাজ শেষে তাঁকে তাঁর পারিবারিক কবরস্থান সাতক্ষীরার সদর উপজেলার বৈকারি গ্রামে দাফন করা হয়। শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে মাওলানা আব্দুল খালেকের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স বৈকারি পৌঁছালে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁকে শেষবারের মতো দেখতে ছুটে আসেন ছোট-বড় সবাই। এ সময় কাঁদতে থাকেন গ্রামবাসী। জানাযা নামাজের আগে মরহুমের স্মৃতিচারণ করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অধ্যক্ষ মোঃ ইজ্জত উল্লাহ, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি ও খুলনা অঞ্চল পরিচালক মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যান ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাষ্টার শফিকুল আলম, খুলনা মহানগরীর সাবেক আমীর আবুল কালাম আজাদ, সাতক্ষীরা জামায়াতের আমীর মুহাদ্দিস রবিউল বাশার, নায়েবে আমীর অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম মুকুল, শেখ নুরুল হুদা, জেলা সেক্রেটারী মাওলানা আজিজুর রহমান, এড, আব্দুস সুবহান মুকুল, শহর ছাত্রশিবিরের সভাপতি শিমুল হোসেন, সদর জামায়াতের আমীর মাওলানা শাহাদাৎ হোসেন, শ্যামনগর জামায়াতের আমীর অধ্যাপক আব্দুর রহমান, কাজী সিদ্দিকুর রহমান, চেয়ারম্যান আব্দুল গফফর, শহীদ হাসানসহ অনেকে। বৈকারির শিকরা বিশাল ফুটবল ময়দানে অনুষ্ঠিত জানাযার নামাজে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেনী-পেশার লক্ষাধিক মানুষ অংশ নেয়। মরহুমের জানাযা নামাজের আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, মাওলানা আব্দুল খালেক মন্ডল বর্তমান সরকারের জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মাজলুম অবস্থায় ইন্তিকাল করেছেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর শাহাদাত কবুল করুন। তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত আলেমে দ্বীন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও সদালাপী মানুষ। আজকের এই মুহূর্তে বিশ্বের কোটি-কোটি মানুষের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা আর অশ্রুশিক্ত চোখ জায়নামাজ ভাসাচ্ছে এই প্রিয় মানুষটির জন্য। তিনি বলেন, জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে মাওলানা আব্দুল খালেক কেমন লোক ছিলেন। সামাজিক জীবন: জনাব মাওলানা আব্দুল খালেক মন্ডল ১৯৯৫ সালে উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে রৌপ্যপদক লাভ করেন। তিনি স্থানীয় বেশ কিছু মসজিদ, গ্রোথ সেন্টার ও হেলথ কমপ্লেক্স নির্মান করেছেন। এছাড়াও তিনি আলামীন ট্রাস্টের সহ-সভাপতি ও জামিয়াতুল মুদাররেসিনের জেলা সভাপতির দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। তিনি ১৯৫৭ সালে আনসার এবং প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ (নিয়োরার) এর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন; যেমন: ভারত, নেপাল ও ভুটান ইত্যাদি। কে এই আব্দুল খালেক মন্ডল? কেন তিনি ফ্যাসিস্ট সরকারের টার্গেটে পড়ে গেলেন? ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৩। আল্লামা দেলওয়ার হোসাইন সাইদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার দিন। এই দিন আল্লামা দেলওয়ার হোসাইন সাইদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সাতক্ষীরায় ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ রাজপথে বিক্ষোভ প্রতর্শন করে। রায় ঘোষণার পর দুপুর তিনটার দিকে সাতক্ষীরার কদমতলা মোড় থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল শহরের দিকে অগ্রসর হয়। বিক্ষোভ মিছিলটি সাতক্ষীরা সার্কিট হাউজ মোড়ে পৌছালে যৌথবাহিনীর সদস্যরা প্রতিরোধ করে। এরপর বিক্ষোভ কারীরা প্রতিরোধ ভেঙ্গে শহরের দিকে প্রবেশ করতে চাইলে ম্যাজিস্ট্রেচের নির্দেশে পুলিশ বিজিবি গুলি চালায়। এতে জামায়াত শিবিরের ৬ নেতাকর্মী ঘটনাস্থলে শাহদাতবরণ করে। এর পর থেকে টানা হরতাল অবরোধের ডাক দেয় জামায়াত। গোটা সাতক্ষীরা যেন উত্তাল হয়ে উঠে। অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে গোটা সাতক্ষীরা। বিভিন্ন স্থানে জামায়াতের অসংখ্য নেতাকর্মী প্রাণ হারায়। একই সময় সাতক্ষীরা জামায়াতের আমীরের দায়িত্বে ছিলেন মাওলানা আব্দুল খালেক। আন্দোলন দমাতে তাকে টার্গেট করা হয়। প্রথমে বুলড্রোজার দিয়ে তার বসতবাড়ি ভাংচুর চালানো হয়। পরে তার নিকট আত্নীয় স্বজনদের বাড়িও বুলড্রোজার দিয়ে ভাংচুর করা হয়। গ্রেফতার এড়িয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান মাওলানা আব্দুল খালেক মন্ডল। ২০১৫ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর ২০১৮ সালের ৫ মার্চ তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। ২০২২ সালের ২৪ মার্চ তাকে ফাঁশিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু দন্ডের আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। সেই থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি জেলখানাতেই ছিলেন। ২০ জুলাই বৃহষ্পতিবার সন্ধা ৬টার দিকে খুলনার আড়াইশ বেড হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার বাড়ি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বৈকারি গ্রামে। মাওলানা আবদুল খালেক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রাথী হিসেবে বিপুল ভোটে সাতক্ষীরা সদর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়াও তিনি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার চেয়ারম্যান হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর আগে তিনি সাতক্ষীরা সদরের বৈকারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি সাতক্ষীরা আগরদাড়ী কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সাতক্ষীরা এলাকায় হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতনের মত মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি অভিযোগ আনা হয় মাওলানা আবদুল খালেকের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠে গোটা দেশ। সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন অপরাধের তদন্তে স্বাধীনতাত্তোর গঠিত বিভিন্ন তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্ট এবং সরকারি নথিতে কোথাও তাঁর নাম ছিল না। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পূর্ব পর্যন্ত তথাকথিত মিথ্যা অভিযোগে সারা বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা তো দূরে থাক একটি জিডি পর্যন্ত করা হয়নি। মাওলানা আব্দুল খালেক বড় জামাই বর্তমান কুশখালি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আব্দুল গফফর। তিনি জানান, তার শ্বশুর মাওলানা আব্দুল খালেক অন্যান্ত ভাল মানুষ ছিলেন। সাতক্ষীরার সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন। তিনি সাতক্ষীরা বাসীর সুখে-দুঃখে, সুদিনে-দুর্দিনে সব সময় সাথে ছিলেন। শ^শুরের ভাল বাসার কারণেই জনগণ তাকে নির্বাচিত করেছেন। আল্লাহ প্রদত্ত এক বিস্ময়কর প্রতিভা। ইসলামপ্রিয় জনগণের রুহানি উস্তাদ ও ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ। তিনি, ব্যক্তি জীবনে অল্পে তুষ্ট, স্বচ্ছ চিন্তা, সরল জীবন-যাপনে অভ্যস্থ, অত্যন্ত ভদ্র-নম্র, মার্জিত, পরিশীলিত, মৃদুভাষী এক অসাধারণ ইসলামী ব্যক্তিত্বের অধীকারী ছিলেন। বার বারি নিবাঁচিত জনপ্রতিনিধি হয়েও তার বসতবাড়ির অবস্থা একেবারেই নাজুক। স্থানীয়রা বলেন, অধ্যক্ষ মাওলানা আবদুল খালেক সাতক্ষীরা অঞ্চলের একজন অবিসংবাদিত নেতা। তিনি ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি বিপুল ভোটে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ছাত্র জীবনের সকল পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন। কারাগারের বন্দী জীবনে তিনি কুরআন হিফজ করেন। পাকিস্থান আমলে আয়ুব সরকার তাকে স্বর্ণ পদক উপহার দেন। সাতক্ষীরার মানুষ তাঁকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে।